সারা বাংলা

নীরবতা ভেঙে ৫৬ বছর পর ভোটকেন্দ্রে রূপসার নারীরা

দীর্ঘ ৫৬ বছর পর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা ভোটকেন্দ্রে এসে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

স্থানীয়ভাবে বহু বছর ধরে নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হলেও, সেই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ভেঙে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেছে তাদের সরব উপস্থিতি।

সকালের সূর্য উঠতেই ইউনিয়নের কেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের ভিড় চোখে পড়ে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রথা ভাঙার এক প্রতীকী মুহূর্ত।

গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে কথা হয় ৭০ বছর বয়সী আয়েশা বেগমের সঙ্গে। জীবনে এই প্রথম ভোট দিতে এসেছেন তিনি। মুখে উচ্ছ্বাসের হাসি। তিনি বললেন, “খুবই ভালো লাগছে। এটাই আমার প্রথম ভোট।”

এত বছর কেন আসেননি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরে বলেন, “নিষেধ ছিল। স্থানীয় লোকজন বোঝানোর পর এবার এলাম।” একই সুর নূরজাহান বেগমের কণ্ঠেও। বিয়ের ৪৫ বছর পার করেও কখনো ভোট দেননি।

এবার কেন এলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সবাই বলছে; নারীরা বাজারে যায়, চাকরি করে, সব কাজই করে; তাহলে ভোট দিতে পারবে না কেন? ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া হারাম নয়। তাহলে সমস্যা কোথায়? এখন বুঝেছি, এত দিন ভোট না দিয়ে ভুল করেছি।”

গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এ কে এম লোকমান হাকিম জানান, এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৬০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৮১১ এবং নারী ১ হাজার ৭৯২ জন। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৪০১টি, যার মধ্যে নারী ভোটার ১৫৯ জন।

রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার ২৯৯ জন। ফলে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে স্থানীয়ভাবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন সময়ে নারীদের ভোটে অংশ নিতে উৎসাহ দিলেও এত বছর তারা কেন্দ্রে আসেননি।

সম্প্রতি চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় ইমামসহ নারীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে নারীদের ভোটাধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হয়। ইউনিয়নের আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক দ্বিধা কাটানোর চেষ্টা করা হয়।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, “ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের ভোট দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। ৫৬ বছর আগে স্থানীয় পর্যায়ে দেওয়া সাময়িক নির্দেশনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, যা বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়।”

দীর্ঘ নীরবতার পর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীদের এই পদচারণা তাই কেবল ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; এটি এক সামাজিক পরিবর্তনের গল্পও।