ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শহর কক্সবাজারে নেমে এসেছে নীরবতা। ভোটারদের নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান এবং পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে দীর্ঘতম এ সমুদ্রসৈকত এখন প্রায় পর্যটকশূন্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের আগে ও পরে মিলিয়ে ১৫ দিনে পর্যটন খাতে শত কোটি টাকার লোকসানে আশঙ্কা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের দিনসহ আগে-পরে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। তবে, এর আগে থেকে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছেন অনেক পর্যটক।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলের অধিকাংশেই কক্ষ বুকিং নেমে এসেছে ১০ শতাংশের নিচে। কোথাও কোথাও তারকা হোটেলে ১০-১৫ শতাংশ রুম বুকিং থাকলেও সাধারণ হোটেলগুলোতে বুকিং নেই বললেই চলে। ফলে পুরো পর্যটন খাতেই বড় ধস নেমেছে।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার রাইজিংবিডিকে বলেন, “নির্বাচন উপলক্ষে অনেকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। হোটেল খাতের কর্মীরাও ছুটিতে গেছেন। পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় পর্যটকদের ঘোরাফেরা সীমিত হয়েছে। এ কারণে হোটেল-মোটেল জোন ও সমুদ্রসৈকত ফাঁকা রয়েছে। অন্যান্য ছুটির দিনের তুলনায় এবার পর্যটন খাতে শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সামনে রমজান মাস, পর্যটক সমাগম আরো কমতে পারে। ফলে ক্ষতি আরো বাড়বে।”
ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টুয়াক) সভাপতি রেজাউল করিম জানান, নির্বাচনি পরিস্থিতির কারণে হোটেল-মোটেলে বুকিং কমেছে। তারকা হোটেলে ১০-১৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে, যার বেশির ভাগ বিদেশি নাগরিক। দেশীয় পর্যটক তেমন নেই। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনি আবহে পর্যটন জোনে নীরবতা নেমে এসেছে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সৈকতের গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন পর্যটক ঘুরছেন। কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ ঝালমুড়ি, পান ও আচার বিক্রেতা বসে আছেন ক্রেতার আশায়।
কক্সবাজারের হোটেল পাড়া
ঝালমুড়ি বিক্রেতা আল আমিন বলেন, “পর্যটক না থাকায় বেচাকেনা নেই বললেই চলে। অন্য সময় ছুটির দিনে প্রতিটি পয়েন্ট পর্যটকে ভরপুর থাকে। এবার নির্বাচনকে ঘিরে সৈকত ফাঁকা, আমাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে।”
লাবণী পয়েন্টের আচার বিক্রেতা রাজিব দাস বলেন, “আগে দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হতো। এখন ৪০০ টাকাও হচ্ছে না।”
চটপটি বিক্রেতা মো. রাসেল বলেন, “পর্যটক থাকলে দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয়। এখন নিজের খরচই তুলতে পারছি না। কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
ঝিনুক ব্যবসায়ী রায়হান উদ্দিন বলেন, “আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক না থাকলে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যেতে হয়। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই দোকান বন্ধ রেখে বসে আছি।”
এদিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরাঘুরি করা কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে কথা হয়। রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক হাসান তৌফিক বলেন, “নির্বাচনের কারণে অনেকে ভ্রমণ বাতিল করেছেন। আমরা আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম, তাই চলে এসেছি। তবে, সৈকত এত ফাঁকা আগে কখনো দেখিনি।”
সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা রুকাইয়া সুলতানা বলেন, “ভিড় না থাকায় ঘোরাঘুরি আরামদায়ক হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দোকানপাট ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা। আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই।”
ঢাকার বনশ্রী থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রাফি করিম বলেন, “পরিবহন সীমিত থাকায় অনেকেই আসতে পারেননি। আমরা ব্যক্তিগত গাড়িতে এসেছি। হোটেলে রুম পাওয়া সহজ হয়েছে, তবে পর্যটক কম থাকায় পুরো শহরটা কেমন নীরব মনে হচ্ছে।”
খুলনা থেকে আসা রিদুয়ান-সাইরিন দম্পতি জানান, তারা মূলত ছুটির সুযোগে এসেছেন। নির্বাচনি পরিবেশের কারণে অনেক বন্ধু-পরিচিত তাদের ভ্রমণ স্থগিত করেছেন।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে অন্যান্য সময়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকে ভরপুর থাকলেও এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সদ্য সম্পন্ন হওয়া নির্বাচন পরবর্তীতে এবার দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেনি আশানুরূপ পর্যটক।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “ভোটের সময় মানুষ নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করায় তুলনামূলকভাবে পর্যটক কম ছিল। দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এমনটি প্রত্যাশা করছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবারো পর্যটকরা কক্সবাজারে ভিড় করবেন।”