সারা বাংলা

লালমনিরহাটে ‘দুর্গ’ হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে জাতীয় পার্টি 

জাতীয় পার্টির (জাপা) অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। শুধু পরাজিত হওয়াই নয়, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ তিন হেভিওয়েট প্রার্থী জামানত খুইয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট না পাওয়ায় এ লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে জাপার প্রার্থীদের। অন্যদিকে, দীর্ঘ ৪৭ বছর পর জেলার সবকটি আসনে নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

গত এক দশকে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা এখন আর নেই। লালমনিরহাট জেলার তিনটি আসনে জাপা প্রার্থীদের প্রাপ্ত মোট ভোটের যোগফল মাত্র ৮ হাজার ১১১, যা দলটির অস্তিত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে ১ লাখ ভোট ছিল, এখন তা হাজারে নেমেছে। লালমনিরহাটের নির্বাচনি ইতিহাসে জাতীয় পার্টির এমন শোচনীয় পরাজয় আগে কখনো দেখা যায়নি।  

লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসন এই আসনটি জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নিজস্ব আসন হিসেবে পরিচিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জি এম কাদের এই আসনে ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩২ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু, এবার এই আসনে জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জাহিদ হাসান লিমন লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করে পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ১৫০ ভোট। যেখানে মোট প্রদত্ত ভোট ছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৫৬২টি। এই ধসকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘অবিশ্বাস্য’ বলে অভিহিত করেছেন।

লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী ও কালীগঞ্জ) আসন এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এলাহান উদ্দিনের ফল সবচেয়ে করুণ। ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৯৩টি প্রদত্ত ভোটের বিপরীতে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৮১০ ভোট। একসময়কার শক্তিশালী এই ঘাঁটিতে জাপার এমন ভোটপ্রাপ্তি দলের তৃণমূল কর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। 

লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম) আসন এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রার্থী হয়েছিলেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ ২ লাখ ৯১ হাজার ২২২টি ভোটের মধ্যে পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ১৫৮ ভোট। হেভিওয়েট প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি জামানত রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

লালমনিরহাটের তিনটি আসনে এবার ভোটার উপস্থিতি এবং সচেতনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনটি আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৭ হাজার ১৭৭টি। এই বিশাল সংখ্যক ভোটের মধ্যে লাঙ্গল প্রতীক পেয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। 

সাধারণ ভোটাররা বলছেন, জাতীয় পার্টির নীতিহীন অবস্থান এবং বড় দলের লেজুড়বৃত্তি করার কারণেই তারা লাঙ্গল প্রতীক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। 

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাধারণ ভোটার এবং বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জাপার পতনের বেশকিছু কারণ জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ তকমা সাধারণ মানুষের মতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্য এবং তাদের ওপর ভর করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার অপচেষ্টা ভোটাররা মেনে নেননি। অনেকেই মনে করছেন, জাপার রাজনৈতিক মেরুদণ্ড না থাকায় মানুষ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন।

নেতাদের হঠকারী সিদ্ধান্ত, কর্মীদের অবমূল্যায়ন ও প্রতিশ্রুতি না রাখা

দলটির শীর্ষ নেতাদের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অবমূল্যায়ন জাপাকে ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত করেছে। নির্বাচনের আগে জাপার প্রার্থীরা বরাবরই এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের কাছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন, মোগলহাট স্থলবন্দর সচল করা এবং চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু, বারবার সুযোগ পেয়েও সেসব বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো ভূমিকা না রাখায় সাধারণ মানুষ এবার ব্যালটের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছেন।

১৯৭৯ সালের পর লালমনিরহাটের সবকটি আসনে বিএনপির জয় এবং জাতীয় পার্টির এমন শোচনীয় পরাজয় এই জনপদের রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। জাতীয় পার্টি যদি তৃণমূলের আস্থা এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এই 'দুর্গ’ উদ্ধার করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পার্টির জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, দল এখন হাইব্রিড নেতাদের দখলে। যারা ত্যাগী কর্মী, তাদের মূল্যায়ন নেই। আগে মানুষ লাঙ্গল বলতে পাগল ছিল, আর এখন মানুষ জাপার নেতাকর্মীদের হাসির পাত্র মনে করে। রাজনৈতিক ভুলের কারণেই আজ এই ভরাডুবি।

একসময়ের ‘লাঙ্গলের ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে এখন জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে খোদ নেতাকর্মীদের মধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে। 

লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, “এই অঞ্চলের মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে জাতীয় পার্টি যে নাটক করেছে, তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন ভোটাররা। তারা ক্ষমতায় থেকেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা কিংবা মোগলহাট স্থলবন্দর সচল করার মতো মৌলিক দাবিগুলো পূরণ করেননি। বরং পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে তারা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতে সহায়তা করেছেন। লালমনিরহাটের মানুষ আর কোনো ধোঁকাবাজিতে বিশ্বাস করে না, যার প্রমাণ এই নির্বাচনের ফল।”