ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে খুলনা বিভাগ থেকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন চারজন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারা। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পাঠ করান।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা জেলার ৬টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি জয় পেলেও খুলনা জেলায় কাউকেই মন্ত্রী পরিষদে জায়গা দেওয়া হয়নি। ফলে জেলার মানুষ বঞ্চিত হয়েছে বলে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন নাগরিক সমাজের নেতারা।
খুলনা বিভাগের চারজন হলেন- নিতাই রায় চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান (পূর্ণ মন্ত্রী) এবং অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও শেখ ফরিদুল ইসলাম (প্রতিমন্ত্রী)।
নিতাই রায় চৌধুরী: মাগুরা-২ (শালিখা, মহম্মদপুর ও সদরের আংশিক) আসনে জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসেন বিএনপির প্রার্থী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত মনোনীত মুশতারশেদ বিল্লাহ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯৯ ভোট। নিতাই রায় চৌধুরী এর আগেও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। চতুর্থ জাতীয় সংসদে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান: ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান। ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের প্রয়াত স্কুল শিক্ষক বাবার ছয় সন্তানের মধ্যে মেজো তিনি। দুই কন্যা সন্তানের জনক আসাদুজ্জামান।
তিনি ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৫ সালে আসাদুজ্জামান বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি হাইকোর্ট ডিভিশনে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ২০০৫ সালে আপিলেট ডিভিশনে নিয়োগ পান। অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আইন পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দেশের ১৭তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। সে সময় বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মামলা জট কমানো, আইনের শাসন শক্তিশালী করা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় তার প্রস্তাবগুলো ব্যাপক গুরুত্ব পায়। এসব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বর্তমান সরকারের নবগঠিত মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এবার তিনি পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত: যশোর-৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি মোট ২ লাখ ১ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মো. আব্দুল কাদের পেয়েছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬৩ ভোট। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
অনিন্দ্য ইসলাম ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট যশোরের ঘোপ জেল রোডে পিতা মরহুম তরিকুল ইসলামের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী তারিকুল ইসলামের ছেলে। অনিন্দ্য ইসলাম যশোর জেলা বিএনপির সক্রিয় সদস্য এবং কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনিন্দ্য ইসলাম ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণ রসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞানে ১৯৯৬ সালে বিএসসি অনার্স এবং ১৯৯৭ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০২ সালে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি টিভি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনিন্দ্য ইসলাম ল্যাবস্কান মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, লোকসমাজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি যশোর মেডিসিন ব্যাংক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, যশোর ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, যশোর প্রেস ক্লাব, যশোর চেম্বার অব কমার্স, যশোর ক্লাব, ঝিনাইদহ এক্স ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন, গ্রাজুয়েট বায়োকেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ বায়োকেমিক্যাল সোসাইটির আজীবন সদস্য। তিনি বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
শেখ ফরিদুল ইসলাম: বাগেরহাট -৩ (মোংলা ও রামপাল) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই চমক দেখালেন লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ দুই হাজার ১৯৩ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। এলাকায় তিনি বিনামূল্যে কয়েক লাখ মানুষের চোখের চিকিৎসাসহ অসহায় মানুষকে সহায়তা করে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন।
খুলনা জেলা বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভ: মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদে খুলনা জেলা বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, “বরাবরের মতো এবারো খুলনার মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছে। খুলনার মানুষ আশা করেছিল, এই জেলা থেকে একজন সংসদ সদস্যকে পূর্ণ মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হবে। তবে, তা দেওয়া হয়নি। এটি বড় বঞ্চনার উদাহরণ।”
তিনি বলেন, “খুলনার শিল্প-কলকারখানা বন্ধ, গ্যাস সরবরাহ নেই, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা। এ ব্যাপারে যারা মন্ত্রিসভায় কথা বলবে— সেই প্রতিনিধি থেকে খুলনাবাসীকে বঞ্চিত করা হয়েছে।”
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় খুলনার কেউ না থাকায় এ সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সন্দিহান।”
তিনি বলেন, “এবারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খুলনার মানুষ আশা করেছিল, মন্ত্রীপরিষদে গিয়ে এই অবহেলিত মানুষের উন্নয়ন নিয়ে অন্তত একজন হলেও কথা বলবেন। তবে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এতে শুধু খুলনার মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সারাদেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
খুলনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আসাদুর রহমান বলেন, “যশোরে ৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি জয়লাভ করেছে মাত্র একটি আসনে। একইভাবে বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যেও মাত্র একটি আসন পেয়েছে বিএনপি। এই দুই জেলা থেকে নির্বাচিত দুইজন সংসদ সদস্য— যথাক্রমে যশোরের অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বাগেরহাটের শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিভাগীয় শহর ও শিল্প-বন্দর নগরী খুলনার ৬টি আসনের মধ্যে মহানগরের একটিসহ ৪টি আসনে বিএনপি জয়লাভ করলেও বিগত দিনের ন্যায় এবারো খুলনায় কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেওয়া হয়নি। ফলে খুলনাবাসী বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।”
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম, বিভাগীয় শহর হিসেবে খুলনাকে এক নম্বরে রাখা হবে। আমরাসহ খুলনাবাসী হতাশ হয়েছি। খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে আমরা চারটিতে জয়লাভ করেছি। কাজেই মন্ত্রিসভায় কাউকে স্থান না দেওয়ায় হতাশ হয়েছি।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে খুলনা-৪ আসন থেকে আজিজুল বারি হেলাল, খুলনা-৩ আসন থেকে রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৫ আসন থেকে আলী আসগার লবি এবং খুলনা-১ আসন থেকে আমীর এজাজ খান নির্বাচিত হন।