সারা বাংলা

ভালো রাস্তা ভেঙে ড্রেন তৈরি, এলাকাবাসীর ক্ষোভ

দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষার পর বছর দেড়েক আগে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংযোগ সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর থেকেই সড়কটি নিয়মিত রোগী যাতায়াতের পাশাপাশি সব ধরনের যান চলাচলে ব্যস্ততম সড়কে পরিণত হয়। তবে হঠাৎ করেই দুই দিন আগে সড়কটির পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন রাস্তার একপাশ বন্ধ করে ক্রস ড্রেন মেরামত করা হচ্ছে। এর জন্য রাস্তাটির এক পাশ ভেঙে উপরের স্লাব খুলে ফেলা হয়েছে। 

মাত্র দেড় বছরের মাথায় সড়কে হঠাৎ এমন সংস্কারের কাজ ‍শুরু করায় হতবাক ওই এলাকার বাসিন্দারা। তারা বগুড়া সড়ক ও জনপদ বিভাগের এমন কাজকে অনিয়ম, খামখেয়ালিপনা আর রাষ্ট্রের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন।  

বগুড়া সওজ কার্যালয় থেকে জানা গেছে, বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল টু শজিমেক হাসপাতাল সংযোগ সড়কের জন্য ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার সড়ক তৈরিতে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ১৫৩ কোটি ৬৭ লাখ ৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ১৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ইউটিলিটি শিফটিংয়ে ১ কোটি ২৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং পূর্ত ব্যয় বা নির্মাণ কাজের খরচ হয়েছে ২০ কোটি ৬ লাখ ৬৭ হাজার হাজার টাকা। বর্তমানে ওই সড়কে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ক্রস ড্রেনের কাজ চলছে। সেখানে আরসিসি কাজ করা হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ক্রস ড্রেন নির্মাণের জন্য যে অংশ ভাঙা হয়েছে সেখানে পূর্ব থেকেই ড্রেন ছিল এবং ড্রেনের দুইপাশে যে ইটের গাঁথুনি রয়েছে সেগুলো খুব বেশি পুরনো নয়।

স্থানীয়রা জানায়, উত্তর দিক থেকে আসা পানি নিষ্কাশনের জন্য সেখানে আগে থেকেই থাকা ড্রেন ছিল। তবে সেটি ছিল কিছুটা সরু। পরে রাস্তা নির্মাণের সময় এর প্রস্থ কিছুটা বাড়িয়ে দুই পাশে ইট দিয়ে ড্রেন তৈরি করা হয়। ড্রেনের উপরের অংশের জন্য আরসিসি স্লাব দিয়ে ঢাকনা দেওয়া হয়। এরপর পুরো রাস্তা কার্পেটিং করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, “এই সড়কটি অনেক আগেই হওয়ার কথা ছিল। নানা কারণে দেরি হলেও শেষ পর্যন্ত নির্মাণের পর ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আবার রাস্তা ভেঙে সেখানে কাজ করা হচ্ছে। ভালো রাস্তা ভাঙার কারণ কী? যে কাজটি করা হচ্ছে সেই কাজটি যখন রাস্তা নির্মাণ করা হয় তখন করতে পারেনি?”

তিনি অভিযোগ করেন, ব্যস্ততম এই সড়কের একাংশ ভেঙে রাখায় ছাত্রছাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। তিনি সরকারের প্রতি নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যে টাকা বরাদ্দ হয়, সেটা যেন সঠিকভাবে ও মজবুত কাজের মাধ্যমে ব্যয় করা হয় এটাই আমাদের চাওয়া।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “যখন রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়, তখন পরিকল্পিতভাবে এই ক্রস ড্রেনটিও করা যেত। ইটের গাঁথুনি দিয়ে না করে আরসিসি দিয়েই করা যেত। তখন তো তারা রাস্তার দুই পাশের ড্রেনগুলো আরসিসিই করেছে। তাহলে এই ক্রস ড্রেন কেন করলো না? এমন কাজের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং এলাকার সাধারণ মানুষসহ যান চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

সাগর নামে অপর বাসিন্দা বলেন, “নতুন সড়ক তৈরির পর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার এক বছরের মধ্যেই আবার রাস্তা খুঁড়ে ড্রেন নির্মাণের কাজ প্রতারণার সামিল। এত বড় বাজেটের একটি রাস্তা নির্মাণের সময়ই টেকসইভাবে এই ক্রস ড্রেন নির্মাণ করা উচিত ছিল। অতীতেও আমরা দেখেছি, কোথাও রাস্তা মেরামত মানে কার্পেটিং করা হয়েছে মাত্র এক মাস। এর মধ্যেই রাস্তার এক অংশ ভেঙে ফেলেছে। আসলে এটা সরকারি অর্থ কামানোর এক ধরনের পরিকল্পনা।”

বগুড়া সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, “মেডিকেল সংযোগ সড়কে বর্তমানে একটি ক্রস ড্রেনের কাজ চলছে। মূল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপিতে এই ক্রস ড্রেনের কোনো প্রভিশন ছিল না। সেখানে আগে থেকেই একটি ইটের ক্রস ড্রেন ছিল। তবে সেটি এখন খুবই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রচুর পানি জমে দুই পাশে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যমান ড্রেন দিয়ে পানি ঠিকমতো নিষ্কাশন হচ্ছে না।”

তিনি বলেন, “ড্রেনটির লোড বহনের সক্ষমতা কমে গেছে। যেকোনো সময় এটি ভেঙে গিয়ে সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকি এড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম থেকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি চুক্তির মাধ্যমে নতুন করে আরসিসি ক্রস ড্রেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

শুধুমাত্র রাস্তাটি নির্মাণ ব্যয় ২০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকায় রাস্তার মধ্যখানের ক্রস ড্রেনটা ওই সময়ই কেন আরসিসি দিয়ে নির্মাণ করা হয়নি? টেকসইয়ের চিন্তা ওই সময়ই না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মূল প্রকল্পের আওতায় এই ক্রস ড্রেন নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না। হয়তো আগে বিদ্যমান ইটের ড্রেনটি সংস্কার করা হয়েছিল। তবে দুই পাশের ড্রেনগুলো আরসিসি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, তাই মাঝখানে দুর্বল ড্রেন রেখে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। জাতীয় মহাসড়ক শ্রেণির সড়কে টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে আরসিসি ড্রেনই প্রয়োজন।”

জাতীয় মহাসড়ক শ্রেণির সড়কে টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে আরসিসি ড্রেনই প্রয়োজন, প্রকল্প পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের সময়ই আপনাদের কেন এটা চিন্তায় আসলো না, জানতে চাইলে তিনি কোন যৌক্তিক মন্তব্য করতে পারেননি।