প্রতি বছরের মতো এবারও সাতক্ষীরার নলতা ওরছ শরিফ চত্বরে নলতায় আহছানিয়া মিশনের উদ্যোগে মাসজুড়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তর ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে।
এটি দেশের থেকে বড় ইফতারের আয়োজন বলে দাবি করেছেন আয়োজকরা। এই ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে রোজাদার মুসলমানেরা ছুটে আসে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ইফতারের আয়োজন শুরু হয়।
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) কালীগঞ্জ উপজেলার নলতায় গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা ইফতার প্রস্ততের কাজে ব্যস্ত। কেউ তৈরি করছেন সিংগাড়া, কেউ দুধের ফিন্নি। কেউবা ব্যস্ত ছোলা ও ডিম সিদ্ধ করার কাজে। উদ্দেশ্য নির্ধারিত সময়ের আগে ৬ হাজার মানুষের ইফতার তৈরির কাজ শেষ করা। নির্ধারিত সময়ে ইফতার তৈরি শেষে এবার বণ্টনের পালা। সুন্দর ও সুচারুভাবে ইফতার বণ্টনের কাজে নিয়োজিত আছে আড়াইশ থেকে তিনশত স্বেচ্ছাসেবী। তারা স্বেচ্ছাশ্রমে রোজাদারদের সেবায় ইফতার বণ্টনের কাজে অংশ নিতে পেরে খুশি।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পীর এ কামেল আলহাজ খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর ভক্তরা হাজার হাজার মানুষের এই ইফতার তৈরি থেকে পরিবেশন করে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে আখেরাতে তাদের পথ সুগমের প্রত্যাশা করে। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। সোয়াবের আশায় অনেক পীর ভক্ত অনুদান দিয়ে ইফতারে অংশ নিয়ে থাকে বলে জানিয়েছে মিশন কর্তৃপক্ষ।
প্রতিদিন কম-বেশি পাঁচ হাজার মানুষের ইফতার পরিবেশন করতে এতটুকু বিশৃঙ্খলা হয় না।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় নিজের জন্মভূমি নলতা গ্রামে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ নলতা আহছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে রমজান মাসে ক্ষুদ্র পরিসরে ইফতার আয়োজন শুরু হয়। পরে আয়োজনের প্রসার বড় হতে থাকে। খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তরা প্রতি বছর এই আয়োজন অব্যাহত রেখেছে।
করোনা পূর্ববর্তী সময়ে একসঙ্গে ১০ হাজার রোজাদারকে ইফতার করানো হতো। করোনায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর তা নেমে পাঁচ থেকে সাত হাজারে দাঁড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এতিমখানা, মসজিদ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য বিতরণ করা হয়ে থাকে।
কর্মরত বাবুর্চিদের কেউ ৩৫ বছর, কেউবা ২৫ বছর আহছানিয়া মিশনে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা জানান, ভোর ৬টা থেকে তাদের ইফতার তৈরির কাজ শুরু হয়। ডিম, ছোলা, চিড়া, কলা, ফিন্নিসহ সমস্ত আয়োজন শেষ করতে বিকেল ৫টা বেজে যায়।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের নির্বাহী সদস্য আলহাজ মো. ইউনুছ জানান, পীর কেবলা বেঁচে থাকতে রমজান মাসে এখানে ছোট পরিসরে ইফতারের আয়োজন করা হতো। উনার মৃত্যুর পর তার একনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত খাদেম মৌলভী আনছার উদ্দীন বড় পরিসরে ইফতারের আয়োজন করেন। ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তরা এখানে আসে।
অনুদানে অংশ নিয়ে সোয়াবের ভাগিদার হতে চান অনেকে। তারা মনে করেন, এশিয়া মহাদেশের বৃহৎ ইফতার মাহফিলে কারো না কারো অছিলায় দোয়া কবুল হবে। এই দোয়ার ওছিলায় তারা নাজাত পাওয়ার আশা করেন।
শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় বৃহস্পতিবার দূর-দূরান্ত থেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা ইফতার করতে আসে। জুম্মার নামাজ আদায় শেষে ইফতার করে বাড়ি ফিরে যায়। রমজান মাসে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ইফতার করানো হয়।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, করোনার আগে এখানে ১০ হাজার মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হতো। করোনার জন্য বন্ধ থাকার পর গত বছর থেকে আবারো ইফতার পরিবেশনের কাজ শুরু হয়। আগের মতো বড় না হলেও এখনো প্রতিদিন ৫ হাজার সাড়ে ৫ হাজার মানুষ ইফতার করেন।
এই আয়োজনে প্রতিদিন আড়াই লাখ টাকা খরচ হয় বলে মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক সম্প্রীতিরও অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে হাজারো মানুষ নলতা শরিফে সমবেত হয়। রমজানজুড়ে এই গণ-ইফতার বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।