সারা বাংলা

ঝালকাঠিতে মুড়ি ভাজায় নারীদের কর্মসংস্থান, চাহিদা বাড়লেও কারিগরের দুঃখ

পবিত্র রমজানে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ মুড়ি। নানা আয়োজন থাকলেও মুড়ির কদর আলাদা। রমজানকে ঘিরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের ৯টি গ্রামসহ আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামে তিন শতাধিক পরিবার দিনরাত ব্যস্ত মুড়ি ভাজার কাজে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানরাও হাত লাগায় এ কাজে। তাদের আশা, বাবা-মায়ের আয় ভালো হলে ঈদে সালামিও মিলবে বেশি।

রমজান মাসে দিনব্যাপী সিয়াম সাধনার পর ইফতারে মুড়ি অন্যতম খাদ্যপণ্য। এ চাহিদা পূরণে নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের তিমিরকাঠি, জুড়কাঠি, ভরতকাঠি, দপদপিয়া ও রাজাখালি গ্রামসহ আশপাশের আরো অন্তত ১৫টি গ্রামে এখন যেন মুড়ি ভাজার উৎসব চলছে। এখান থেকে প্রতিদিন শতাধিক মণ মুড়ি জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। বছরে প্রায় কোটি টাকার মুড়ি উৎপাদন হয় এ এলাকায়।

ঝালকাঠির ‘মুড়ি পল্লী’ হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিন শতাধিক পরিবার মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুস্বাদু ও মোটা দানার জন্য নলছিটির মুড়ির কদর রয়েছে সারাদেশে। সব পরিচয় ছাপিয়ে গ্রামগুলো এখন ‘মুড়ির গ্রাম’ হিসেবেই পরিচিত।

নাখোচি জাতের ধান প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় এ মুড়ির চাল। এতে কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় না, ফলে এটি স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, আর পাইকারি দর ৯০ টাকা। তবে অধিকাংশ কারিগরের নিজস্ব পুঁজি না থাকায় আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়।

রমজানের বাড়তি চাহিদা মেটাতে ভোর ৪টা থেকে শুরু হয় মুড়ি ভাজা, চলে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। প্রচণ্ড গরম আর কঠোর পরিশ্রম উপেক্ষা করে কাজ করেন কারিগররা। জ্বালানি কাঠ ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি ৫০ কেজি চালের মুড়ি ভেজে তারা পান মাত্র ৪০০ টাকা মজুরি। এই আয়েই চলে সংসার, সন্তানের পড়াশোনাসহ সব খরচ।

মুড়ির কারিগর ও আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকাসহ বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি সংগ্রহ করেন। তবে মেশিনে ভাজা চিকন মুড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হাতে ভাজা মুড়ির বাজার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, আর শ্রমিকেরাও পাচ্ছেন কম পারিশ্রমিক। বছরের পর বছর এ পেশায় থাকলেও পুঁজির অভাবে অনেক পরিবারই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেনি। তাদের দাবি, মুড়ি ভাজাকে কুটির শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হোক।

মুড়ি প্রস্তুতকারী সালেহা বেগম বলেন, “রোজা রেখে চুলার আগুনের তীব্র গরম সহ্য করে কাজ করা কঠিন, বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য। তবু এই কাজ নারীদের জন্য আলাদা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।”

জেলা সদরের পাইকারি ব্যবসায়ী মানিক লাল জানান, এ অঞ্চলের হাতে ভাজা মোটা মুড়ির জনপ্রিয়তা এখনো অনেক। তবে মেশিনে ভাজা মুড়ির কারণে বাজারদর কমে যাওয়ায় কারিগররা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ঝালকাঠির উপ-ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, “এ এলাকা মুড়ির জন্য বিখ্যাত। শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা সমিতি গঠন করে ঋণ নিতে চাইলে বিসিক থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে।”