সারা বাংলা

নিজে দাঁড়াতে না পারলেও, সংসার দাঁড় করিয়েছেন রায়হান

রায়হান আলী (৩০) শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক। হাঁটতে-চলতে না পারলেও দারিদ্রের কষাঘাত তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবায়তার সামনে দাঁড় করিয়েছে। চার সদস্যের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নামতে হয়েছে কাজে। ভিক্ষাবৃত্তি বেচে না নিয়ে করছেন হাঁস-মুরগি-কবুতর বিক্রি। এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে অভাবের সংসারকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই যুবক পড়ালোখা করিয়ে বড় বোনকে দিয়েছেন বিয়ে।

রায়হান পাবনার বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের সোনাপদ্মা গ্রামের মৃত আলাউদ্দিন আলীর ছেলে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জন্ম থেকে দুই পায়ে চলার শক্তি নেই রয়হানের। দুই হাতও কিছুটা অস্বাভাবিক। শৈশবেই হারিয়েছেন বাবাকে। চার সদস্যের পরিবারে রয়েছে বৃদ্ধা মা ও দুই বোন। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল এসে পড়ে তার কাঁধে। 

অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর না করে ছোটবেলায় মায়ের জমানো সামান্য পুঁজি দিয়ে রায়হান শুরু করেন হাঁস-মুরগি-কবুতরের ব্যবসা। তিনি গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে হাঁস-মুরগি-কবুতর কেনেন এবং পরে তা বাজারে বিক্রি করেন। রায়হান রাকসা বাজার, গেটের বাজার ও নতুন বাজারসহ কয়েকটি বাজারে কেনা-বেচা করেন। সীমাহীন কষ্ট নিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ছুটে চলেছেন জীবনযুদ্ধে।

এলাকাবাসী জানান, রায়হান প্রতিদিন গড়ে ১০০-২০০ টাকা আয় করেন। এই সামান্য আয়েই চলছে অভাবের সংসার। রায়হানের এই সংগ্রাম শুধু নিজের টিকে থাকার জন্য নয়, বরং পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য। তিনি তার বড় বোনকে অনার্স পর্যন্ত পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন, যা এলাকায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

রায়হান সম্পর্কে নতুন বাজারের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কষ্ট ও আত্মবিশ্বাস দেখে আমি আমার দোকানের সামনে তাকে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ওর মতো পরিশ্রমী ছেলে সচরাচর দেখা যায় না। প্রতিবন্ধী হলেও সে কারো কাছে হাত পেতে কিছু নেয় না।’

স্থানীয় সমাজকর্মী বুলবুল হাসান বলেন, “রায়হানের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাদের বিমোহিত করে। সে সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদ হওয়ার চেষ্টা করছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে সে বড় একটি দোকান দিয়ে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হতে পারতো।”

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে রায়হান বলেন, “অনেকে আমাকে ভিক্ষা করতে বললেও আমার লজ্জা লাগতো। তাই সম্মান নিয়ে বাঁচার জন্য এই কাজ নিয়েছি। পুঁজির অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারছি না। যদি সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসতেন এবং একটি স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা হতো, তবে পরিবার নিয়ে আরো ভালোভাবে চলতে পারতাম।”

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। উপজেলা প্রশাসন থেকে এমন মানুষদের জন্য কিছু করার সুযোগ রয়েছে। ওই যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলে, উপজেলা প্রশাসন থেকে যতুটুক সহযোগিতা করা সম্ভব তা করার চেষ্টা করব।”

পাবনা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুল কবীর বলেন, “রায়হানের এই জীবন সংগ্রামের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এমন মানুষ সমাজের জন্য অনুকরণীয়। বেসরকারিভাবেও অনেকের এগিয়ে আসা উচিত।”