সারা বাংলা

লেবুর চড়া দাম, কী বলছেন চাষি ও পাইকাররা

রমজান মাসের শুরু থেকেই বাজারে লেবুর দাম চড়। আগে যে লেবু প্রতি পিস ২ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেই লেবু ২০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক লাফে কয়েক গুণ দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।

কেন বেড়েছে লেবুর দাম, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঢাকার ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় লেবুচাষি ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলেছেন রাইজিংবিডি ডটকমের এই প্রতিবেদক। তারা দাবি করছেন, ফলন কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় লেবুর সরবরাহ কম। তাই, দাম বেড়েছে।

চাষিরা বলছেন, অনাবৃষ্টির কারণে এবার উৎপাদন কম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছে, অচিরেই দাম কমবে।

স্থানীয় বাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে ছোট লেবু প্রতি হালি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং বড় লেবু ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চড়া দামের কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। 

রাজধানীসহ আশপাশের বাজারে যেসব লেবু সরবরাহ করা হয়, তার বড় অংশই আসে ঢাকার ধামরাই উপজেলা থেকে। এ উপজেলার ৫-৬টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামে ৭০০ হেক্টরের বেশি জমিতে লেবু চাষ করা হয়। বছরজুড়ে এসব বাগান থেকে লেবু তুলে পাঠানো হয় বড় বাজারগুলোতে।

ধামরাইয়ের বালিয়া এলাকায় আছে একটি পাইকারি লেবুর বাজার। সেখানকার কৃষক ও পাইকাররা জানিয়েছেন, একবার লেবুর বাগান তৈরি করলে সেখান থেকে ১০-১২ বছর পর্যন্ত লেবু উত্তোলন করা যায়। তবে, বাগান থেকে লেবু তোলা হয় সমিতির মাধ্যমে। পাইকাররা বছর চুক্তিতে বাগান কিনে নেন। এরপর পাইকারদের সমিতির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে লেবু উত্তোলন করা হয়।

তারা বলেন, শীতের শেষ সময়ে এসে লেবুর ফলন কিছুটা কমে যায়। গরম বা বৃষ্টির সময়ে যেখানে ১০০ শতাংশ জমিতে ৫-৬ ফুট লম্বা বড় টুকরি ভরে লেবু তোলা যায়, সেখানে শীতের সময়ে অন্তত ৪০০-৫০০ শতাংশ জমির লেবু তুলতে হয় একটি টুকরি ভরতে।

স্থানীয় লেবুচাষি আবুল কাশেম বলেছেন, “বর্তমান লেবুর বাজার আমাদের জন্য স্বাভাবিক। এখন চৈত্র মাস, খরার সময়। জমির মাটি খড়খড়ে, উর্বরতা কম। সে কারণে উৎপাদন কম। যখন ফসল উৎপাদন কম হয়, স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যায়।”

তিনি বলেন, “আর এক মাস পর দেখবেন, বৃষ্টি হলে উৎপাদন বেড়ে যাবে। তখন চাহিদা কমে যাবে, আমরা দাম কম পাব। বর্তমানে ৩০০ শতাংশের বাগান থেকে এক খাচি (টুকরি) লেবু তুলি। একটি খাচি পূর্ণ করতে ৫০ গামলা লেবু লাগে। কিছুদিন পর ১০০ শতাংশ জমিতে তিন খাচি লেবু তুলতে পারব। তখন চাহিদা থাকবে না। দেখা যাবে, তখন শ্রমিক খরচেও ভর্তুকি দিতে হবে।”

সেচের খরচ বেড়েছে, জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন সেচ পাম্প দিয়ে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে, এটা বাড়তি খরচ। ফলে, এখন যে বেশি দাম পাচ্ছি; বছর শেষে দেখবেন, কয়েক মাসের লোকসানসহ আমরা কিছুটা লাভ পাব।”

একই এলাকার লেবু পাইকার আলী হোসেন জানান, তাদের কাছ থেকে লেবু যায় কারওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজারে। সেখান থেকে আবার বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়।

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে যে লেবু চাষ হয়, বাগানে সারা বছর শ্রমিক কাজ করে, খরচ আছে। তারপর দেখা যায়, খুব অল্প পরিমাণ লাভ পাওয়া যায়। এখন ৪০-৬০ হাজার টাকা খাচি পাওয়া গেলেও এক মাস পর দেখা যাবে এক খাচি লেবু বিক্রি হবে ১০ হাজার বা তারও কম টাকায়। তখন লোকসান হবে, এমনকি খরচও উঠবে না। এখনকার বাজারদরকে আমাদের প্রচুর লাভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।” 

আরেক পাইকার আজাহারুল ইসলাম বলেন, “বছরে একবারই লেবুর দাম ভালো থাকে। প্রতি শতাংশ জমির বাগান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় এক বছরের জন্য কেনা হয়। বর্তমানে ফলন কম, এজন্য লেবুর দাম বেশি। এই দামটা থাকে দুই মাস।”

তিনি বলেন, “৪০০-৫০০ শতাংশ জমি ঘুরে এক খাচি লেবু তোলা যায়। ৫০০-৬০০ শতাংশ জমিতে বছরে খরচ আছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাগানের দামই প্রায় ৪ লাখ টাকা। এতে বছরে সবমিলিয়ে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। ফাল্গুন ও চৈত্র—এই দুই মাস ভালো দাম পাওয়া যায়। তারপর আবার ভর্তুকি। গৃহস্থ ও পাইকার দাম পাবে না। আর এক-দেড় মাসের মধ্যে দাম কমে যাবে। খরচও উঠবে না।”

মো. রাসেল নামে আরেক পাইকার বলেন, “৩০০-৪০০ শতাংশ জমি ঘুরেও অনেক সময় এক খাচি লেবু তোলা যায় না। বর্তমানে যে ব্যয়, অনেকের খরচের অর্ধেকও উঠে আসেনি। এখন লেবু নেই, ফলন অত্যন্ত কম। বৃষ্টি নেই, খরা। এজন্য দাম বেশি। জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় মাসে দাম একদম পড়ে যাবে।”

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, “ধামরাই কৃষির জন্য সম্ভাবনাময় উপজেলা। এখানকার ঐতিহ্যবাহী ফসল লেবু। ধামরাইয়ের বড় এলাকাজুড়ে লেবু চাষ হয়। বর্তমানে প্রায় ৭০০ হেক্টর জমিতে লেবুবাগান আছে। আমাদের প্রায় ১ হাজারের বেশি লেবুচাষি আছেন। তারা লেবু থেকে ভালো লাভ পাচ্ছেন। কারণ, একবার বাগান করলে ১০ থেকে ১২ বছর উৎপাদন পাওয়া যায়। এখন বাজারে লেবুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চাহিদা থাকায় দামটা একটু বেশি। তবে, কিছুদিন পরে বৃষ্টিপাত হলে এবং অফ সিজন শেষ হলে লেবুর উৎপাদন বাড়বে, তখন দামও কমে যাবে।”