সারা বাংলা

সুনামগঞ্জে নদীতে ধান চাষ, পানির সংকটে ভোগান্তি

বিস্তীর্ণ ফসলি জমি দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি আসলে একটি নদী। বর্ষা এলেই নদীটি ফুলে–ফেঁপে ওঠে, আর শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ করেন কৃষকরা। এমন চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলা এলাকার পুরাতন সুরমা নদীতে।

একসময়ের খরস্রোতা এই নদী ছিল বেশ গভীর। তখন বড় বড় লঞ্চ চলাচল করত নদীপথে। নদী থেকে ধরা মাছ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাত। বোরো মৌসুমে আশপাশের ফসলি জমিতে সেচের প্রধান উৎস ছিল এই নদী ও কালনী নদীর পানি। তবে, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পলি জমে ধীরে ধীরে নদীর নাব্য কমে গেছে। বছরের প্রায় পাঁচ মাস শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশে পানি থাকে না বললেই চলে। ফলে, যেখানে একসময় পারাপারে নৌকার প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে দুই তীরের মানুষ হেঁটে যাতায়াত করেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর আলী বলেন, “আগে শুষ্ক মৌসুমেও এই নদীতে বড় বড় নৌকা চলত। মানুষ বাড়িঘর তৈরির জন্য বাল্কহেডে করে বালু–পাথর আনত, ব্যবসার মালামালও নদীপথে আসত। এখন নদী পলিতে ভরাট হয়ে গেছে, প্রায় শুকিয়ে গেছে। মানুষ হেঁটে পার হয়, কেউ কেউ চাষাবাদও করছে। আমরা চাই সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনুক।”

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এটি একসময় বড় নদী ছিল, এখন আমরা সেখানে কৃষিকাজ করছি। অথচ আমাদের ফসলি জমিতে পানির অভাবে ঠিকমতো চাষ করা যাচ্ছে না। যদি নদীতে পানি থাকত, তাহলে এখান থেকেই সেচ নিয়ে ধান চাষ করা যেত এবং নৌপথে যাতায়াতও করা সম্ভব হতো। কিন্তু, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা নানা সমস্যায় পড়ছি।”

এ দৃশ্য শুধু পুরাতন সুরমার নয়। হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের এক সময়ের খরস্রোতা মহাসিং নদী, শমেশ্বরী নদীসহ আরো কয়েকটি নদীতেও এখন স্থানীয়রা বোরো ধানের আবাদ করছেন। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে চর জেগে উঠেছে। শুষ্ক মৌসুমে সেই চরজুড়ে চলছে চাষাবাদ।

নদীর এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে নদী পাড়ের মানুষের জীবনেও। নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানি সংকট। পরিবেশবাদীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

শান্তিগঞ্জের বাসিন্দা হায়দার আলী বলেন, “এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা পানি। সেচ দেওয়ার সময় নদীতে পানি পাওয়া যায় না, কারণ নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। আবার বর্ষায় অল্প পানিতেই নদী উপচে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যায়। মানুষ দুইভাবেই ভোগান্তিতে পড়ছে। নদী খনন ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলায় ছোট–বড় মিলিয়ে ১০৬টি নদী রয়েছে। এর বেশিরভাগই এখন নাব্যতা সংকটে ভুগছে। বর্ষায় কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। পরিবেশকর্মীরা এ অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করছেন এবং দ্রুত নদী খননের দাবি জানাচ্ছেন।

পরিবেশবাদী আলী আহমদ বলেন, “হাওরাঞ্চলের নদীগুলো এত দ্রুত ভরাট হয়ে যাবে এবং কৃষিকাজের অবস্থা এতটা সংকটাপন্ন হবে—এটা কেউ কল্পনাও করেনি। আগে থেকে পরিকল্পনা না থাকায় আজ আমরা এই পরিস্থিতিতে পড়েছি। হাওর, নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এখনই সচেতন হতে হবে।”

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড–এর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক জানান, ভরাট হয়ে যাওয়া ১৯টি নদীর মধ্যে ১২টি নদী খননের একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পুরাতন সুরমাসহ বেশ কয়েকটি নদী খনন করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্য নদীগুলোতেও কাজ করা হবে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “নদী রক্ষা কমিশন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি জরিপে জেলায় ১০৬টি নদীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর বেশিরভাগ নদীই নাব্যতা হারিয়েছে এবং বছরের ছয়–সাত মাস পানিশূন্য থাকে।”

তিনি আরো বলেন, “একসময় নদীর পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি আসত, যা নিয়মিত অপসারণ না হওয়ায় নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগের মতো বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না এবং মেঘালয় থেকে আগের মতো প্রবল ঢল নামছে না। নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণে বিস্তারিত জরিপ করে কোথায় কত পলি অপসারণ প্রয়োজন তা নির্ধারণ করতে হবে। সরকারের ইশতেহারে খাল খননের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার আওতায় এসব নদী অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সুনামগঞ্জের নদী সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব।

হাওরবাসীর প্রত্যাশা, সরকারের সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগে সুনামগঞ্জের সংকটাপন্ন নদীগুলো আবারো স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণ ফিরে পাবে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের আশা, নদী খননের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে তাদের জীবন, ফিরবে নদীর পুরোনো রূপ।