ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত কৃষকদল নেতা তরু মুন্সীর লাশ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে ঝিনাইদহ মর্গ থেকে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে হামদহ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিল শেষে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা, নিহতের স্বজনরা বক্তব্য রাখেন।
সংঘর্ষে গুরুতর আহত কৃষকদল নেতা তরু মুন্সী (৪৪) ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
তরু মুন্সি সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি ওই ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মৃত মুনসুর আলী মুন্সী ছেলে।
রাত ৯টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসনে কৃষকদল নেতার মৃত্যুর তথ্য জানান।
জেলা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক সাকিব আহমেদ বাপ্পী বলেন, কৃষকদল নেতা তরু মুন্সী মাথায় গুরুতর জখম নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা গেছেন। এ ঘটনার পর নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আহত কৃষকদল নেতার মৃত্যুর খবর ছড়ার পর ঝিনাইদহ জেলা শহরসহ সদরের গান্না ইউনিয়নে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখার পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন করা হয়। দুপুরে ইফতারের আয়োজন নিয়ে নারী কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে মহিলা কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হয়। তাদের উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে কৃষকদল নেতা তরু মুন্সীর অবস্থা গুরুতর হলে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।
বিএনপির নেতাকর্মীরা লাশ নিয়ে মিছিল করে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে হামদহ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা কৃষকদল নেতা তরু মুন্সীকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছে। তার মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। যে কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি এই ন্যক্কারজনক হত্যার বিচার দাবি করেন।
তিনি আরো বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী তরু মুন্সীর মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং সেই আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, তরু মুন্সীর মৃত্যু স্ট্রোককজনিত কারণে হয়েছে বলে দাবি করেছে জামায়াতে ইসলামী। শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে সদর উপজেলা জামায়াতের থানা আমীর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মাধবপুর গ্রামে মহিলা জামায়াতের ইফতার মাহফিল ছিল। সেখানে বিএনপির লোকজন গিয়ে নারীদের মারধর ও শ্লীলতাহানি করে। যে কারণে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে দুইপক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়।
তরু মুন্সীর মৃত্যু স্ট্রোককজনিত কারণে হয়েছে উল্লেখ করে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, তরু মুন্সী শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। মারামারির কারণে তিনি আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে স্ট্রোক করেন। যে কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
এই মৃত্যু নিয়ে অপরাজনীতি করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের উপর হামলা ও দোকানপাট ভাঙচুর করা হচ্ছে।
এদিকে, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে র্যাব-৬-এর একটি আভিযানিক দল মামলার প্রধান আসামি ডা. মনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল বলেন, ‘‘আমরা ইতোমধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছি। অপরাধী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছেন।’’
শনিবার র্যাব-৬ ঝিনাইদহ ক্যাম্পের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কৃষকদল নেতা হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি ডা. মনোয়ার হোসেনকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
জামায়াত কর্মীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর তাদের বেশ কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব নিয়মিত টহল দিচ্ছে।
স্থানীয় বেতাই পুলিশ ক্যাম্পের তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল আলীম জানান, শুক্রবার বাধবপুর গ্রামের ওহিদুলের বাড়িতে জামায়াতের মহিলা কর্মীরা তালিম করার জন্য জড়ো হয়। মহিলা কর্মীদের জড়ো হওয়া দেখে প্রতিবেশি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন কারণ জানতে চান। এ নিয়ে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে বিএনপি ও জামায়াতের বেশ কিছু কর্মী-সমর্থক আহত হন।
স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহাজান আলী বলেন, জামায়াতের ওহিদুল, তাবিবুর, আব্দুল হামিদ নিলু, মনিরুল, নাসির ও প্লাবন লাঠিসোঁটা নিয়ে আগে থেকে ওঁৎ পেতে ছিল এবং সংঘর্ষের সময় বিএনপির ওপর হামলা চালায়।
সংঘর্ষের পর জামায়াতের কর্মীরা গান্না ইউনিয়ন বিএনপির অফিস ভাঙচুর চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে গান্না বাজারে জামায়াতের কর্মীদের দোকানপাট ও পার্শ্ববর্তী বাড়িঘরে দেশীয় অস্ত্রসস্ত্রসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গান্না ইউনিয়ন যুদবলের নেতা আবুল কালাম বলেন, জামায়াতের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে। তারা এখনো হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ টিম মোতায়েন রয়েছে। ওই এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সংঘর্ষে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।