বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হওয়ার তিনদিন পার হলেও স্বজনদের কান্না থামেনি। নিহত আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়–স্বজনরা একে অপরকে জড়িয়ে করছিলেন কান্না।
শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে রাজ্জাকের বাড়ির সামনে মসজিদ থেকে আনা কয়েকটি খাটিয়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির আঙিনায় ছিল গভীর নীরবতা। কিছুক্ষণ পরপর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা যাচ্ছিলেন কবরস্থানে। সেখানে প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া ও কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখছিলেন তারা।
বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মিতুর বাবা আব্দুস সালাম খুলনার কয়রা থেকে মোংলা কবরস্থানে আসেন। মেয়ের জামাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার দুটো মেয়েই হারিয়ে গেলো। আমার বাবা অনেক আগেই মারা গেছে। এখন মা-ও নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”
আব্দুস সলামকে কাছে পেয়ে এ সময় নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা আরো বেশি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে, আকাশপানে চেয়ে ছিলেন আশরাফুল রহমান জনি। চোখের সামনেই হারিয়েছেন স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ সদস্যকে। হারানোর কিছুই যে আর অবশিষ্ট নেই। এখন তিনি আর কান্না করছেন না। শোকে পাথর হয়ে গেছেন। গাড়ির ভিতর থেকে বের করা বিভৎস স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, ভাই, বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি মরদেহও দেখেন আশরাফুল। পরিবারের সবাইকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে পেছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন তিনি। তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন।
নীয় জিহাদ হাওলাদার বলেন, “খুলনা-মোংলা মহাসড়ক যেন একটি মৃত্যুর কূপ। প্রায় এখানে সড়কে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এখনো যদি প্রশাসন বা সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই মৃত্যুর সংখ্যা আগামীতে আরো দীর্ঘ হতে পারে।”
নিহতের বাড়ির পাশে বসবাস করা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা তিনদিন ধরে শুধু কান্না শুনছি। এমন ঘটনা আগে কখনো দেখিনি। রাজ্জাক ভাই, তার ছেলে সাব্বিরসহ বাকি সবাইকে হারিয়ে পুরো মহল্লা শূন্য হয়ে গেছে। কখনো ভাবিনি যে কোনোদিন আমাদের বাসার পাশে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে। আমরা চাই, প্রশাসন যেন দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেয়।”
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে খুলনা–মোংলা মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফবাস ও যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে বর, বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ ৯ জনকে মোংলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। নববধূ, তার দুই বোন ও দাদিকে দাফন করা হয় খুলনার কয়রার নকশা এলাকায় এবং নানিকে দাফন করা হয় চালনা এলাকায়। মাইক্রোবাস চালকের দাফন হয়েছে তার নিজ গ্রাম রামপালে।