সিলেট বিভাগে বাড়ছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ৫৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরো ১১২ জন নারী। ক্রমবর্ধমান এসব ঘটনার কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নারীরা। পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে মোট ১ হাজার ৪৭৬টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৫৪ জন নারী। ২০২৪ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১ হাজার ৩৩০টি। তিন বছরে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং অনলাইন হয়রানির ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ছয় শয্যার একটি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু রয়েছে। সেখানে পাঁচজন সিনিয়র স্টাফ নার্স, চারজন পুলিশ, একজন আইনজীবী এবং ডিএনএ ল্যাবে তিনজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আরডব্লিউডিও–এর স্বাধীনতা প্রকল্পের ভলান্টিয়ার নাফিসা তানজীন বলেন, “যারা প্রকৃতপক্ষে নির্যাতনের শিকার হন, তাদের অনেকেই আইনের দ্বারস্থ হন না। এটি একটি বড় কারণ। ফলে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ অনেক সময় সঠিকভাবে হয় না।”
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনেক অপরাধী শাস্তি থেকে বেঁচে যান। ফলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসেই সেখানে ভুক্তভোগী নারীদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা নেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। সেবা দিতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের ওসিসির কো-অর্ডিনেটর ডা. মুস্তাফা আল্লামা তালুকদার পিয়াল বলেন, “ভুক্তভোগীদের আমরা চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় শিশু বা নারীকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসা দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে হয়।”
তিনি জানান, আগে একটি প্রকল্পের আওতায় এ সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন সীমিত জনবল ও সুযোগ–সুবিধা নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। নতুন করে প্রকল্প চালু করা গেলে সেবার পরিধি আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।
ওসিসির আইন কর্মকর্তা পান্না সমাদ্দার বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মামলার বাইরে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে আপস করা হয়। এতে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। যার কারণে তারা আবারো একই ধরনের অপরাধ করার সাহস পায়।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রয়েছে, তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।”
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসাইন বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় যেসব ঘটনা ঘটে, সেসব বিষয়ে আমরা কঠোরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। ঘটনা ঘটার পরপরই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই।”