ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাটোরে ফিটনেসবিহীন যানবাহন নতুন করে রং করে সড়কে নামানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাহ্যিকভাবে চকচকে রূপ দিলেও এসব গাড়ির অধিকাংশরই নেই বৈধ ফিটনেস সনদ। যা ঘরমুখো মানুষের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ইতোমধ্যে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে ফিটনেসবিহীন ও কাগজপত্রবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না।
নাটোর শহরের বিভিন্ন গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অচল বা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা বাস, ট্রাক ও লেগুনা দ্রুত রং করে নতুনের মতো সাজানো হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটি কোনোভাবে মেরামত করে সড়কে নামানো হচ্ছে যানবাহনগুলো।
কয়েকজন গ্যারেজ শ্রমিক জানান, ঈদকে সামনে রেখে তাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। অল্প সময়ে অধিক সংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত করতে হচ্ছে। অনেক মালিক শুধুমাত্র রং করেই গাড়ি রাস্তায় নামাতে চান, ভেতরের যান্ত্রিক সমস্যাগুলো সমাধানে আগ্রহ দেখান না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে বলে তারা স্বীকার করেন।
নাটোর শহরের বড় হরিশপুর এলাকার গ্যারেজের শ্রমিক কাওসার আহমেদ বলেন, “ঈদের আগে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। মালিকরা দ্রুত গাড়ি দিতে চাপ দেন। অনেক সময় পুরো মেরামত না করেই শুধু রং করে গাড়ি রাস্তায় নামানো হয়।”
একই এলাকার গ্যারেজ ও ওয়াকসপ শ্রমিক শাওন বলেন, “আমরা অনেক সময় মালিকদের বলি যে, গাড়িতে সমস্যা আছে, কিন্তু তারা শোনেন না। শুধু বাইরে রং করে দ্রুত গাড়ি ছাড়ার জন্য চাপ দেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু আমাদের কিছু করার থাকে না।”
গ্যারেজ মালিক ঝন্টু মিয়া বলেন, “ঈদের সময় গাড়ির চাহিদা বেশি থাকে। তাই অনেক পুরোনো গাড়িও ঠিকঠাকভাবে মেরামত না করেই রং করে চালু করা হয়। এতে ঝুঁকি থেকেই যায়।”
নিজাম উদ্দিন নামে এক যাত্রী জানান, ঈদের সময় ঘরে ফেরার তাড়নায় বাধ্য হয়ে এসব গাড়িতে উঠতে হয়। বাইরে থেকে নতুন মনে হলেও যাত্রাপথে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে যাওয়া, ব্রেক ফেল করা কিংবা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময় থাকে।
রফিক নামে অপর এক যাত্রী অবৈধ যানবাহন বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দাবি জানিয়েছেন।
নাটোর বাস-মালিক সংগঠনের সভাপতি লক্ষণ পোদ্দার বলেন, “ঈদের আগে কিছু গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত ও রং করা হয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো কোনোভাবেই ঠিক নয়। এ বিষয়ে মালিকদের আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন।”
নাটোরে ঝলমলিয়া হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, ঈদকে সামনে রেখে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ বিশেষ নজরদারি জোরদার করেছে। ফিটনেসবিহীন, অতিরিক্ত যাত্রীবাহী এবং কাগজপত্রবিহীন কোনো যানবাহনকে মহাসড়কে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। নিয়মিত টহল ও চেকপোস্টের মাধ্যমে এসব যানবাহন শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি বলেন, “যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।” সবাইকে সচেতন হয়ে নিরাপদ যানবাহনে ভ্রমণের আহ্বান জানান তিনি।
নাটোর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো যানবাহন সড়কে চলার আইনগত সুযোগ নেই। তবুও কিছু অসাধু মালিক সাময়িকভাবে রং করে গাড়িকে সচল দেখিয়ে রাস্তায় নামাচ্ছেন। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অভিযান জোরদার করা হবে।
নাটোরের পুলিশ সুপার মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, “ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন শনাক্তে বিশেষ টিম কাজ করবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফিটনেসবিহীন কোনো যানবাহন সড়কে চলতে দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”