কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদ জামাতের পূর্বে শর্টগানের গুলি ফোটানো হয়। এটা বহু বছরের রেওয়াজ। এটা এক বিরল ঐতিহ্য। ঈদ জামাতের পূর্বে কেন এমন ঘটনা, শুরু কবে থেকে; সেটা নিয়ে অনেকের জানার কৌতূহল রয়েছে।
ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিরা জামাতে দাঁড়ান বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনে। রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে শর্টগানের ১০টি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। জামাত শুরুর ১০ মিনিট আগে ৫টি, ৫ মিনিট আগে ৩টি এবং ১ মিনিট আগে ২টি শর্টগানের গুলি ফুটিয়ে জামাত শুরুর সঙ্কেত দেওয়া হয়। প্রথম গুলিটি ছোঁড়েন দায়িত্বরত পুলিশ সুপার। ঈদগার পশ্চিম পাশে একটি টেবিলে সারিবদ্ধভাবে বেশ কয়েকটি গুলি ভর্তি শর্টগান সাজিয়ে রাখা হয়।
ইতিহাস বলছে, দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ঈদগাহের নামে জমি ওয়াকফ করেন। সে ওয়াকফনামায় লেখা আছে, ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, শোলাকিয়া মাঠের বর্তমান বয়স ২৭৭ বছর। ১৮২৮ সাল থেকে জঙ্গলবাড়ীর জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সেই ধারা হিসেব অনুযায়ী, এবার শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
হয়বতনগর জমিদার বাড়ির তৎকালীন জমিদার সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ ১৮২৯ সাল হতে এই শোলাকিয়া মাঠে ইমাম ছাড়াও তিনি এই ঈদগাহের সর্বপ্রথম মোতাওয়ালী ছিলেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে হয়বতনগর জমিদার পরিবার থেকে মোতাওয়ালী নিযুক্ত হয়ে আসছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে মাঠ পরিচালনা হচ্ছে। শোলাকিয়ার ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় অনেক লেখক বই লিখেছেন। কিন্তু ইতিহাসের কোনো পাতাতেই রেওয়াজ অনুযায়ী গুলি ফুটিয়ে জামাত শুরুর সঙ্কেতের কথা উল্লেখ নেই।
এমন রেওয়াজের বিষয়ে ধারণা প্রকাশ করেছেন হয়বতনগর সাহেব বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁনের নাতি সৈয়দ মো. নাদির। তিনি বলেন, ‘‘আসলে কত বছর বা কবে থেকে এই গুলি ফুটানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে, সেটা বলা মুশকিল। নির্দিষ্ট কোনো সময় আমরাও জানতে পারিনি। তবে দেখছি, দীর্ঘকাল যাবত। পূর্ব পুরুষদের কাছে শোলাকিয়া মাঠের অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু এ বিষয়টি কোনোভাবেই আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’’
তবে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় শোলাকিয়ার প্রবীণ এক ব্যক্তি মো. বজলুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে। তার বর্তমান বয়স পঁচাত্তরের উপর। গল্পকালে তিনি বলেন, ‘‘বাপ-দাদাদের কাছে এমন একটি গল্প শুনেছিলাম। আগে তো প্রযুক্তির যুগ ছিল না, কোনো মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ছিল না। শোলাকিয়ার মাঠও ছিল খোলামেলা। যেহেতু লাখ লাখ মুসুল্লি এখানে অংশ নিতেন, তাই মাঠের পেছনে মুসল্লিদের নামাজ শুরুর সঙ্কেত বুঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হতো। আর সেটি ছিল গ্রামীণ ভাষায় ‘পটকা’। তখনও দুটা-তিনটা করে ‘পটকা’ আকাশে ছুড়ে দেওয়া হতো। সেই ফটকার আওয়াজ ও ধোঁয়া দেখে মুসুল্লিরা নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতো।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘এখন তো আর ‘পটকার’ যুগ নেই। তাই আমার মনে হয়, সেই শব্দ পদ্ধতির ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে গুলির রেওয়াজ শুরু হয়েছে। নয়ত এতবড় জামাতে মুসুল্লিদের সর্তক করা বা নামাজ শুরুর পূর্ব-মুহূর্ত বুঝানো সম্ভব হতো না।’’
যদিও তিনি এটাও বলেন, ‘‘এমন রেওয়াজের সঠিক কোনো ব্যাখ্যা কারো কাছেই নেই। আমি যতটুকু জানি, সেটাও অতীতের গল্প থেকে ধারণাপ্রসূত। আমার মতো যারা এখনো বেঁচে আছেন, তারাও এতটুকুই হয়ত জানবেন।’’
জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত ঈদগাহ পরিপূর্ণ হয়ে বিপুল সংখ্যক মুসল্লিকে আশপাশের রাস্তা, পুকুরপাড়, পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ির আঙিনা, বাড়ির ছাদ, পতিত জমি, নদীর সুপ্রশস্ত সেতুসহ সকল খালি জায়গায় জামাতে কাতার বাঁধতে হয়। মূলত লাখ লাখ মুসুল্লির সমাগমে সকলকে সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করতে যুগ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রাচীন ‘পটকা’ পদ্ধতি থেকে বর্তমানে গুলি ফোটানো হয়, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।