কেউ হারিয়েছেন পুরো পরিবার। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা। আবার নববধূ হারিয়েছেন স্বামী। মুহূর্তে ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কেউ আবার কাগজপত্র হাতে প্রিয়জনের লাশ বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় রেললাইনের লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে নিহত ১২ জনের লাশ রাখা হয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে।
কুমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন যশোর জেলার পিন্টু ইসলামের স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) ও তাদের দুই মেয়ে খাদিজা (৬) এবং মরিয়ম (৩); চাঁদপুরের চাপাতলি এলাকার তাজুল ইসলাম (৬৭); ঝিনাইদহের জুহাদ বিশ্বাস (২৪); যশোরের সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও কোহিনূর বেগম (৫৫); নোয়াখালীর বাবুল চৌধুরী (৫৫); মাগুরার ফচিয়ার রহমান (২৬); চুয়াডাঙ্গার সোহেল রানা (২৫); নোয়াখালীর নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫) এবং লক্ষ্মীপুরের সাঈদা (৯)।
যশোরের গাড়িচালক পিন্টু ইসলাম জানান, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে নোয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করতে যাচ্ছিলেন। পথে ঢাকায় নেমে যান তিনি। রাত ১২টার দিকে দুই মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুলিশের ফোন পেয়ে ছুটে এসে দেখেন, তার পুরো পরিবার নিথর দেহে পরিণত হয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব জানি না। ঈদের আনন্দ করতে যাচ্ছিল তারা, আর কোনোদিন তাদের দেখব না, এটা আমি মানতে পারছি না।”
এ দিকে জুহাদ বিশ্বাসের স্ত্রী রুমি আক্তার দেড় বছরের কন্যা মরিয়মকে কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, “ঈদের আগে মেয়েকে দেখতে আসতে পারেনি। ঈদের রাতে মেয়ের কাছে যাওয়ার পথে সে চলে গেল। আমার আর আমার মেয়ের কেউ রইল না।”
নিহত সাঈদার খালা সাহিদা সুলতানা হিমঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ভাগ্নির লাশ নিতে। তিনি জানান, সাঈদার বাবা-মা গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মেয়েটা আর বাঁচল না। তার বাবা-মাও বাঁচবে কি-না জানি না।”
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান জানিয়েছেন, আহত ও নিহতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লাশ নিজ নিজ বাড়িতে নিতে প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুটি এবং জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রবিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী জানান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।