গাজীপুরজুড়ে যখন ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে, পরিবারে পরিবারে, তখন একই জেলার মনিপুর এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে ধরা পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। বাইরে উৎসবের উচ্ছ্বাস, আর ভেতরে নিঃশব্দ অপেক্ষা-প্রিয়জনদের জন্য।
ঈদের সকালটি এখানে শুরু হয় অন্যরকমভাবে। নতুন পোশাক, বিশেষ খাবার-সব আয়োজন থাকলেও নেই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটি- পরিবারের সান্নিধ্য। শাহানা বেগমের মতো অনেক প্রবীণ মা-বাবা দিনভর অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের জন্য, একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য, কিংবা একবার ‘মা’ ডাক শোনার জন্য। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা অনেক সময়ই থেকে যায় অপূর্ণ।
ছয় সন্তানের জননী হোসনে আরার গল্প যেন আরও বেদনাদায়ক। জীবনের সবটুকু সময় সন্তানদের মানুষ করতে ব্যয় করেছেন তিনি। অথচ বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই সময়ে, ঈদের দিনটিও কাটে একাকীত্বে। চোখে ভাসে অতীতের ঈদ- যেখানে ছিল পরিবার, ছিল আনন্দ ভাগাভাগি। এখন সেই স্মৃতিই সঙ্গী।
এই কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক প্রবীণ নারী-পুরুষ বাস করছেন। তাদের অধিকাংশই একসময় পরিবারের ভিত্তি ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসায় গড়ে তুলেছেন নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাদের ঠিকানা হয়েছে এই আশ্রয়কেন্দ্র।
এখানে থাকা মানেই শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; বরং এক ধরনের মানসিক শূন্যতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই। অনেকেই সন্তানদের অবহেলা বা অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজেরাই দূরে সরে এসেছেন। তাদের ভাষায়, “অপমান নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মান নিয়ে দূরে থাকাই ভালো।”
তবুও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কমে না। বুকভরা কষ্ট নিয়েও তারা সন্তানের মঙ্গল কামনাই করেন। অভিযোগের বদলে দোয়া-এই যেন তাদের জীবনের শেষ কামনা।
কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ অবশ্য চেষ্টা করে এই শূন্যতা কিছুটা হলেও লাঘব করতে। ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক, উন্নত খাবার ও বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে তারা প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন।
হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার জানান, “আমরা চেষ্টা করি যেন তারা পরিবারবিহীন অনুভব না করেন। কিন্তু পরিবারের অভাব তো আর পুরোপুরি পূরণ করা যায় না।”
সব আয়োজনের পরও থেকে যায় এক গভীর অভাব- আপনজনের। যে শূন্যতা কোনো উৎসব, কোনো আয়োজন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
এই চিত্র শুধু একটি কেন্দ্রের নয়; এটি আমাদের সমাজেরও প্রতিচ্ছবি। যে বাবা-মা আমাদের বড় করেছেন, জীবনের প্রতিটি ধাপে পাশে থেকেছেন, তাদের শেষ সময়টা যেন কাটে ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানের মাঝে-এটাই হওয়া উচিত আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই আনন্দ পৌঁছে যাবে তাদের কাছেও- যারা নীরবে অপেক্ষা করে আছেন, শুধুই একটু আপনজনের স্পর্শের জন্য।