জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। তেল পাওয়ার আশায় অনেকেই মোটরসাইকেলের ট্যাংকি খুলে হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভিড় সামাল দিতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) সদর উপজেলার ভূল্লী তিয়াস তিমুসহ বিভিন্ন পাম্পে সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত মানুষ তেলের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে, আবার কেউ বাইকের ট্যাংকি খুলে হাতে নিয়ে লাইনে যোগ দিচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ হওয়ায় সবাই তেল পাচ্ছেন না। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কেউ কেউ নিয়ম ভেঙে আগে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যে কারণে পাম্পগুলোতে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটছে।
শুক্রবার জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পে মোটরসাইকেলের ট্যাংক নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় সোহেল রানা নামে এক যুবককে। তিনি বলেন, “গত দুইদিন আমি দুইটি ফিলিং স্টেশনে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল কিনতে পারিনি। সিরিয়ালে আমার সুযোগ আসার আগেই পাম্পে তেল শেষ হয়ে যায়। আমার গাড়িতে খুবই অল্প পরিমাণে জ্বালানি ছিল।”
তিনি বলেন, “ব্যবসার কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহার খুবই জরুরি। তাই আমি আজকে ঝুঁকি নিয়েই মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে যাই। ফলাফল, মাঝ রাস্তায় আমার গাড়ির জ্বালানি শেষ। সেখান থেকে ফিলিং স্টেশন অনেক দূরে। আমি গাড়ি সেখানেই রেখে একটি বোতোল নিয়ে রিকশায় করে ফিলিং স্টেশনে যাই। কারণ, গাড়ি চালিয়ে কোনোমত বাসায় নিয়ে যাওয়া জরুরি। সেসময় ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল সরবরাহ করছিল, তবে বিশাল বড় সিরিয়াল ছিল। আমি বোতলে কিছুটা পেট্রোল চাইলে কর্তৃপক্ষ আমাকে বোতলে পেট্রোল দেয়নি। তারা জানায়, কোনো বোতল বা জারে পেট্রোল দেওয়া নিষেধ আছে। গাড়ি নিয়ে আসতে হবে। অনেক অনুরোধের পরেও তারা আমাকে জ্বালানি দেয়নি। উপায় না পেয়ে আমি ফিরে যাই।”
এই চালক বলেন, “কিছুদূরে একটি মোটরসাইকেল ম্যাকানিকের দোকান থেকে মোটরসাইকেলের ট্যাংকি খুলে নেই। অতদূর রাস্তা গাড়ি ঠেলে আনা সম্ভব ছিল না। ফিরে এসে পেট্রোল পাম্পে দেখি, জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। এরপর রিকশায় করে অন্যন্য ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরছি।”
প্রাইভেটকার ব্যবহারকারী চঞ্চল শেখ বলেন, “আমার গাড়ি পেট্রোল চালিত। জ্বালানির অভাবে ঈদের আগে থেকে আমার প্রাইভেটকার বাসায় বন্ধ পরে রয়েছে। ফলে অনেক বিপাকে পরেছি। কারণ গাড়ি ছাড়া আমার ব্যবসার নিয়মিত কালেকশন বন্ধ হয়ে গেছে।”
ওষুধ কোম্পানির মার্কেটিং অফিসার তানভীর হাসান তানু বলেন, “আমার চাকরি এখন ঝুঁকিতে। মোটরসাইকেল ছাড়া মার্কেটিংয়ের কাজ ঠিকভাবে করা সম্ভাব না। পাবলিক পরিবহনে ঠিকভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। কাজ বাদ দিয়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সিরিয়ালে দাড়িয়ে কিভাবে তেল সংগ্রহ করব।”
ঠাকুরগাঁও সুপ্রিম ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বাবলু বলেন, “আমরা নিয়মিত পেট্রোল বা অকটেন পাচ্ছি না। একদিন বা দুইদিন পরপর তিন হাজার লিটার করে পেট্রোল বা অকটেন পাচ্ছি। তেলের গাড়ি আসার ৬ ঘণ্টা আগে থেকেই দীর্ঘ সিরিয়ালের ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে। অনেক সময় বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।”
পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ঠাকুরগাঁও জেলায় বর্তমানে ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে দুটি, হরিপুরে দুটি, রাণীশংকৈলে পাঁচটি এবং পীরগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে চারটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এসব ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সম্মিলিত চাহিদা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে দেখা দিয়েছে সংকট। ফলে অনেক পাম্পই বন্ধ রেখেছেন মালিকরা।