বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের দুই বংশের সংঘর্ষের ঘটনার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুরুষ শূন্য দুই বংশের বেশিরভাগ পরিবার। সংঘর্ষ চলাকালে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের কারণে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ২০ পরিবারের নারী-শিশুসহ অন্য সদস্যরা।
রান্নার স্থান নষ্ট হওয়ায় শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুরে সবার জন্য এক স্থানে বড় পাত্রে খাবার রান্না হয়। গোসল, পয়োনিষ্কাশন ও দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রচণ্ড বিরম্বনায় পড়তে হচ্ছে নারী ও শিশুদের।
চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের শুকনো খাবার দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যাদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা আবেদন করলে টিনসহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে।”
সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মৃত আবু তৈয়বের স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, “আমি ভিক্ষা করে খেতাম। সব শেষ হয়ে গেছে। ঘটনার দিন রাতে ও শুক্রবার তো আমরা কেউ ঘুমাতে পারিনি। ঘর ও খাবারের স্থান সবইতো আমাদের ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু আমার না সবারই এরকম অবস্থা। যার দুইতলা ভবন আছে, তারাও দুপুরে আমাদের সঙ্গে খাবার খেয়েছে।”
বাবলু শেখ নামে অপর এক ব্যক্তি বলেন, “যে ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট হয়েছে এটা বর্ণনা করা খুবই কঠিন। মনে হয়েছে, আমরা একটি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গেছি। আমাদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। আমাদের রাজিব নামে এক ব্যক্তি মারা গেছে। স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল যেমন লুট করা হয়েছে, তেমনি ঘরে আগুন দিয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। আমরা বিচার চাই। পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক সবাই এসেছিলেন।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি ছাড়া বিশ্বাস ও শেখ পরিবারের বেশিরভাগ পুরুষ। বিশ্বাস পরিবারের নারীরা রয়েছেন শেখ পরিবারের হামলার শঙ্কায়। ইতোমধ্যে তারা সংসারের মূল্যবান মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
ফারুক বিশ্বাসের স্ত্রী রহিমা খানম বলেন, “যখন আলম শেখ হত্যার শিকার হন তখনো শেখ পরিবারের লোকজন আমাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিল। সেই ভয়ে আমরা যতটুকু পারছি সবকিছু এলাকার বাইরে সরিয়ে নিচ্ছি। পুরুষরাতো ভয়ে এলাকা ছাড়া। কখন যে কি হয় জানি না। পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি আমাদের একটাই দাবি, তদন্ত করে এই সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা।”
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “বুধবার যে ঘটনা ঘটেছে এতে কয়েকজন মারা গেলেও অস্বাভাবিক কিছু হত না। শত শত মানুষ আক্রমণ করেছে। তার আগে, দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট মারামারি হয়েছে। আমরা এলাকাবাসীও আতঙ্কে রয়েছি, কখন কি হয় এ নিয়ে।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, মধুমতি নদীর চরের জমি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস এবং শেখ বংশের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এরই জেরে আরিফ শেথ নামের এক যুবককে ফুলকুচি (লোহার সিকের তৈরি এক ধরণের মাছধরা অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করে বিশ্বাস বংশের লোকেরা। পরে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। বিশ্বাস বংশের লোকেরা শেখ পরিবারের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। শেখ বংশের সদস্য রাজিব শেখ নিহত হয়।
এদিকে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাজিবের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। চিতলমারী থানা পুলিশ বাদী হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দেশী অস্ত্র নিয়ে মহড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেছে। মামলায় বিশ্বাস বংশের দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- আবুল খায়ের বাবুল (৫০) এবং মো. হোসেন উকিল (৩৫)।
চিতলমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাস্থলে এখনো পুলিশ রয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। বিশৃঙ্খলার ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। দুজনকে গ্রেপ্তার ও কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষে মামলা গ্রহণ করা হবে।”