অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় মৃতদের মধ্যে ১০ জন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এই সাগরযাত্রায় ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রিয়জনদের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বজনেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জে একসঙ্গে এতগুলো প্রাণহানিতে স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ ভাই, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। যার ফলে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা।
গত ২১ মার্চ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তবরুক থেকে অবৈধ অভিবাসী নিয়ে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবরুকসহ লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেম ঘরে’ এখনো অনেক বাংলাদেশি আটক থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাকে দালালেরা ‘গেম’ বলে। লিবিয়ার যেসব জায়গায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয় এবং পরে নৌকায় তোলা হয়, সেই জায়গাকে দালাল ও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ‘গেম ঘর’ বলে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক প্রাণহানির তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, ঘটনার পর সরকারের কাছে ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য আসে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে গ্রিসের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের ১০ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরে মৃতদের ১০ জন সুনামগঞ্জের বলে রাইজিংবিডি-কে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার। তিনি বলেন, ‘‘তিন উপজেলার ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।’’ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মৃত ১০ জনের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচ যুবক রয়েছেন। তারা হলেন, পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আকলিফ মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), পৌর এলাকার কবিরপুর গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২২), ইছগাঁওয়ের বাছির হোসেনের ছেলে আলী হোসেন (২৫) ও বাউরি গ্রামের সামসুল হকের ছেলে ইবাদত হক সুহানুর ( ২২ )।
মৃতদের পাঁচজন দিরাই উপজেলার। তারা হলেন, তারাপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), একই গ্রামের মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান ( ২৫ ), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), রনারচর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০) এবং কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না (২০)। এছাড়া উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের তারেক (২২) এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
একই নৌকা থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি। পরে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানা যায়, মৃতদের মধ্যে অনেকের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর খবরে নিহতের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। স্বজনদের আহাজারিতে চারপাশ ভারি হয়ে উঠেছে। দালালের খপ্পরে পরে স্বজন হারিয়ে পরিবারের লোকজন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। স্বজনদের লাশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দালাল চক্রের চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মৃত নাঈম মিয়ার বাবা দুলন মিয়া রাইজিংবিডি-কে বলেন, ‘‘আমার ছেলে বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করবে শুধু এই আশায় ঘর ছেড়েছিল। কিন্তু আমি আমার ছেলেকে সারা জীবনের জন্যে হারিয়ে ফেলছি। এখন লাশটাও দেখতে পাচ্ছি না।’’
একই উপজেলার শায়ক মিয়ার চাচাত ভাই সালাম মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘‘দালালদের কথায় বিশ্বাস করে আমরা লাখ লাখ টাকা দিয়েছি। ভেবেছিলাম বিদেশে গিয়ে ওর একটা ভালো ভবিষ্যত হবে। পরিবারের সবাই ভালো থাকবে কিন্তু আজকে সব শেষ।’’ এই ঘটনার পর দালালচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বদরুল কাদির শিহাব বলেন, ‘‘হাওরের সরল সহজ মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই দালাল চক্র, অথচ অনেক ক্ষেত্রে তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’’ অবিলম্বে এ সকল দালালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।