সারা বাংলা

হাম: ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু

ময়মনসিংহে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম নিয়ে তিন শিশু ভর্তি হয়েছে। এখানে গত ১২ দিনে ভর্তি হয়েছে ১০৬ জন; যার মধ্যে ৫ জন মারা গেছে।

বর্তমানে হাসপাতালটি চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৬ শিশু।

রবিবার (২৯ মার্চ) দুপুরে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. গোলাম মওলা সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকেও হাম আক্রান্ত শিশুরা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছে।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবনের ছয় তলার ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তিন ইউনিটে রাখা হয়েছে হাম আক্রান্ত শিশুদের। ১০ শয্যার এসব ইউনিটকে ‘হাম কর্নার’ নাম দেওয়া হয়েছে। বিশেষ মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে সেখানে চিকিৎসা চলছে। তবে, রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেককে রাখা হয়েছে মেঝে ও বারান্দায়।

হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬১১ নম্বর কক্ষে চিকিৎসা নিচ্ছে ২৫ মাস বয়সী শিশু আয়াত। তার মা ঝর্ণা আক্তার কনা ময়মনসিংহ মহানগরীর নগরীর আকুয়া চুকাইতলা এলাকার বাসিন্দা।

তিনি বলেন, “আয়াতের প্রথমে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, শরীর গুটি গুটি লালচে দাগ, মুখের ভিতরে সাদা দাগ দেখা দেয়। তিন দিন ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। উন্নতি না হওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে।”

একই কক্ষে হাম আক্রান্ত নয় মাস বয়সী শিশু নিয়ে ভর্তি আছেন জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার ওমর ফারুক। তিনি বলেন, “জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমি, শরীরে ছোট ছোট লালচে দাগ দেখা দিলে গত ৯ মার্চ সন্ধ্যায় জামালপুর সদর হাসপাতালরে ভর্তি করি। সেখানে ১৫ দিন ভর্তি থাকার পর কোনো উন্নতি হয়নি। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। বর্তমানে হাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। তবে, নিউমোনিয়া কমেনি। যে কারণে এখনো হাসপাতালে আছি।”

কিশোরগঞ্জের ইটনা থেকে যমজ সন্তানকে নিয়ে গত মঙ্গলবার ভর্তি হয়েছেন আল-আমিন ও নাজমা আক্তার দম্পতি। জুঁই ও জুনাইনা নামের দুই শিশুর বয়স ১৪ মাস। শিশুদের নয় মাসের সময় হামের টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও বেড়াতে যাওয়া সে টিকা দিতে পারেননি নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, “টিকা না দিলে এমন হইবো জানলে টিকাটা আগেই দিতাম।”

হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. গোলাম মওলা বলেন, “হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণও রয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি; দুই ধরনের রোগীই আমরা পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে আইসিইউতে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। কয়েক মাস ধরে দু-একজন রোগী পাওয়া গেলেও এ মাসে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তিনটি পৃথক কর্নার করা হলেও সেখানে রোগী না ধরায় হাম আক্রান্ত রোগীদের শতভাগ আইসোলেশনে রাখা যাচ্ছে না। এছাড়া, অন্য রোগীদেরও চাপ রয়েছে।”

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, “হাসপাতাল প্রশাসনের নির্দেশনায়, সাধারণ রোগী থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ রোগীদের মাঝে হাম আক্রান্ত আছে এমন সংখ্যা কম। আমরা হাম আক্রান্ত রোগী পেলে তাকে নির্ধারিত স্থানে পাঠিয়ে দেই। আপাতত তিনটি কক্ষে রোগীদের রাখা হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে আর কী করা যায়।”

তিনি আরো বলেন, “সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লোকজন এই হাসপাতালে এসে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। হঠাৎ কেন হাম রোগী বেড়ে গেল বোঝা যাচ্ছো না। তবে, শিশুদের টিকাদানে সমস্যা হওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যদের দূরে রাখতে হবে ও সাবধানে থাকতে হবে। এই রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে।”

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, “হাম রোগী হঠাৎ বেড়েছে, এ ধরনের রোগী আগে এত বেশি দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি ও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য সহকারীরা আন্দোলনের কারণে টিকাদান সঠিকভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সারা দেশে হামের প্রকোপ বেড়েছে। টিকা সঠিকভাবে দেওয়া হলে হাসপাতালে এত রোগী দেখা যেত না।”

ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফয়সল আহমেদ বলেন, “হাম রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি করে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালের বহির্বিভাগে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড ফেভার ক্লিনিক চালুর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”