রাজশাহী শিশু হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হয়েছিল ২০২২ সালের শেষে। ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে আছে ৫৬ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। এই হাসপাতাল চালুর কথা ছিল ২০২৩ সালের জুনে। কিন্তু দীর্ঘ ৩ বছরেও হাসপাতাল চালু করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ।
এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালে শিশুদের জন্য ২০০টি শয্যা আছে। ১২টি আইসিইউ শয্যা। কিন্তু এখানে সবসময় ১ হাজারের বেশি শিশু বিভিন্ন রোগে ভর্তি থাকছে। আইসিইউর ঘাটতিতে রামেক হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ শিশুর মৃত্যু অব্যাহত আছে। প্রতিদিনই এখানে শিশু মারা যাচ্ছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে ৩৫ শিশু অপেক্ষায় আছে। সোমবার দুপুর ২টা পর্যন্ত এসব শিশুকে আইসিইউতে ভর্তির জন্য নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে শয্যা না থাকায় তাদের ভর্তি করা যায়নি।
রাজশাহী নগরীর টিবি পুকুর এলাকায় ২ দশমিক ৪৪ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে রাজশাহী শিশু হাসপাতাল। এর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। রাজশাহী অঞ্চলের শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষে ২০১৫ সালে প্রকল্প পাস হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় ১৩ কোটি টাকা ধরা হলেও বেশ কয়েকবার সংশোধন করে বাড়ানো হয়েছিল। প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মী কাঠামো অনুমোদনে বিলম্বের কারণে হাসপাতালটি এখনও চালু হয়নি। মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকবার চালুর জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। তবে এই হাসপাতাল চালুর দায়িত্বে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি রামেক হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিস।
রাজশাহী শিশু হাসপাতাল নির্মাণের দায়িত্বে ছিল কেএসবিএল অ্যান্ড এইচই জেভি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ফরহাদ সরকার বলেন, ২০২২ সালের জুন মাসে নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। বাকি যা ছিল তাও শেষ করা হয়েছে। শেষ হওয়ার পর থেকে তারা ভবনটি হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে গণপূর্তের কর্মকর্তাদের কাছে বেশ কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। গণপূর্ণ এখনও আমাদের কাছ থেকে ভবনটি গ্রহণ করেনি। আমরা নিজ খরচে সরকারি স্থাপনাটি পাহারা দিচ্ছি। হাসপাতাল থেকে বৈদ্যুতিক বাল্ব ও তার চুরি হয়ে গেছে।
গণপূর্ত বিভাগ-২ এর প্রকৌশলী কাউসার সরকার বলেন, রাজশাহী সিভিল সার্জনের কার্যালয় বা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশু হাসপাতালের দায়িত্ব নেয়নি। সাংগঠনিক কাঠানো ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং জনবল নির্ধারণ করার কথাও ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা অনুমোদন হয়নি। অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত কে দায়িত্ব নেবে তা স্পষ্ট নয়।
হাসপাতালটিতে ৫৬ শয্যার আইসিইউ ইউনিট আছে। অপারেশন থিয়েটার এবং এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই ইউনিটসহ রোগ নির্ণয় পরিষেবাও আছে।
এদিকে, রামেক হাসপাতাল রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। রামেক হাসপাতালে শিশুদের ২০০ শয্যার বিপরীতে ৫ থেকে গুন বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। শিশুদের শয্যা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে এবং অনেককে বারান্দাতেও থাকতে হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, গেল ১৫ দিনে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ২৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের আইসিইউতে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু শয্যার অভাবে তারা অপেক্ষায় ছিল। বর্তমানে আরও অন্তত ৫৫টি শিশু আইসিইউর অপেক্ষা আছে। হাসপাতালে শিশুদের আইসিইউর শয্যা সংখ্যা ১২টি।
রাজশাহী শিশু হাসপাতালের বিষয়ে তিনি বলেন, শিশু হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা আমাদের না। হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যার সভাপতি ছিলেন রামেক হাসপাতালের পরিচালক এবং সদস্য সচিব ছিলেন সিভিল সার্জন।
ডা. শঙ্কর বলেন, শিশু হাসপাতালের সব অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু জনবল ও পরিচালনার দায়িত্ব রামেক হাসপাতালের না। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যতীত জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলো সিভিল সার্জনের কর্তৃত্বাধীন। এই হাসপাতালের দায়িত্ব সিভিল সার্জনের। জনবল মন্ত্রণালয় থেকে সরবরাহ করা হবে।
রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, গেল বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটিকে চালু করার উদ্যোগ নিতে রামেক হাসপাতালের পরিচালককে দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তারা কেন কিছু করেনি তা বলতে পারবো না। এর আগের পরিচালক চলে গেছেন। নতুন যে পরিচালক এসেছেন তার সঙ্গে আমরা বৈঠক করবো।