সারা বাংলা

নদীপাড়ের আতঙ্ক ‘বালুমহাল’

মানিকগঞ্জে পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী, গাজীখালিসহ একাধিক নদীতে বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন শুরু হয়। প্রতি বছর শত শত ঘরবাড়ি, জমিজমা হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হন। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালে বিধি বহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন বেড়ে যায়। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে নদীপাড়ের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম বালুমহাল। 

প্রশাসনের ভাষ্য, নিয়ম নীতি মেনেই বালুমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে নদী ভাঙন হলেও বালুমহাল এর জন্য দায়ী নয়।  

তথ্য বলছে, প্রতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে ইজারাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়। বিগত বছরগুলোতে যারা বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন তারা চুক্তির শর্ত ভেঙে সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। প্রশাসনের নগন্য অভিযানে শ্রমিকদের জেল জরিমানা হলেও ইজারাদার থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নমনীয় ভূমিকার কারণে ইজারাদার ইচ্ছে মাফিক বালু উত্তোলন করেন। ফলে নদীপাড়ের মানুষ ভূমিহীন, ভিটাহীন হয়েছেন। প্রতিকার না পাওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় জানায়, চলতি বছর মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন তিনটি বালুমহালের দরপত্র আহ্বান করেছে। গত ২৯ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উন্মুক্ত দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে উপযুক্ত দরদাতা না থাকায় হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে দ্বিতীয় বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। 

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহালে বিজু এন্টারপ্রাইজ ইজারাদার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব আছেন মানিকগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কামাল হোসেন। শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল পেয়েছে একরাম এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আছেন জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন খান।

ধুলশুড়া গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, “নদীভাঙনে সব হারিয়ে নতুন করে ১৪ শতাংশ জমিতে ঘরবাড়ি করেছিলাম। সেখানেও ভাঙনে সব নদীর পেটে যাচ্ছে। আগের বার প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও এবার ড্রেজার মেশিনের কারণে জমি নদীতে গেছে।” 

সেলিমপুর চরের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, “হরিরামপুরে পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার মানুষ সর্বশান্ত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বালু কাটার ফলে নদীর পাড়ে ভাঙন বেড়েছে। যারা বালু কাটে তারা অনেক প্রভাবশালী এ কারণে অভিযোগ করে লাভ নেই। বালুমহালের ভেতরও কাটে, বাইরেও কাটে। ফলে বালুমহালের আশেপাশে ভাঙন শুরু হয়।” 

স্থানীয়রা জানান, এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এসব বালুমহাল ইজারা নিয়ে থাকেন। তারা নিয়ম নীতি অনুসরণ করেন না। এসব বিষয় প্রশাসন জানলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বালু উত্তোলনকারীরা কাউকে পরোয়া করেন না। বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হলেও ক্ষতির পরিমাণ বেশি। 

বালুমহাল ইজরা পাওয়া বিজু এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. কামাল হোসেন বলেন, “গত বছরও এই প্রতিষ্ঠান বালুমহাল ইজারা পেয়েছিল। শর্ত ও নিয়ম মেনেই বালু উত্তোলন করা হয়। কারো ক্ষতি করেবালু নেওয়া হয় না। কোনো অনিয়ম হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।” 

বালুমহালের কারণে নদীপাড়ে ভাঙন বেড়ে যায় তারপরও কেন বালুমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে এমন বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, “আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর তা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। হাইড্রোগ্রাফিক প্রতিবেদনসহ সব প্রকার যাচাই বাছাই শেষে বালুমহাল ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ধরনের ক্ষতির বিষয়াদি থাকলে এতগুলো দপ্তর অনাপত্তিপত্র দিতেন না।” 

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “প্রাকৃতিক কারণে নদী ভাঙন সংগঠিত হয়ে থাকে। বালু মহালের কারণে নদী ভাঙনের সম্ভাবনা নেই। যথাযথভাবে নিয়ম মেনে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।” 

বিগত বছরগুলোতে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করেছেন ইজারাদার এমন বিষয় জানালে তিনি বলেন, “নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। তাদের নির্ধারিত সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কেও আইন অমান্য করলে ইজারা বাতিল করে দেওয়া হবে।”