ফাল্গুন ও চৈত্র এলেই যেন এক অদৃশ্য আতঙ্ক নেমে আসে ভাওয়ালের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। প্রতি বছরের এই সময়টাতে রহস্যজনক আগুনে পুড়ে যায় বিস্তীর্ণ বনভূমি। ফলে নষ্ট হয় শাল ও গজারীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বিলীন হয় বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
স্থানীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুর রেঞ্জের আওতায় প্রায় ৯ হাজার ৭১২ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। পাশাপাশি রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের প্রায় ৪০ হেক্টর বনভূমিও শ্রীপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। ইতোমধ্যে এসব এলাকার বড় একটি অংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সাতখামাইর, গোসিঙ্গা, সিমলাপাড়া ও সদর বিটের বিস্তীর্ণ এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত। শুকনো পাতায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত, ফলে অল্প সময়েই বিশাল এলাকা জ্বলতে থাকে। এতে কপিস (নতুন গজানো) গাছসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ ধ্বংস হয়। আগুনের ভয়ে পাখিরা আশ্রয় নেয় উঁচু গাছে, আর বনজ প্রাণী যেমন- শিয়াল, বনবিড়াল ও বানর বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসছে খোলা মাঠে। অনেক ক্ষেত্রে পাখির বাসা ও ছানাও আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। তাদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও প্রকৃতিপ্রেমীরাও। সীমিত জনবল ও সরঞ্জামের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে।
বন বিভাগের ধারণা, কিছু ক্ষেত্রে মাদকাসক্তরা অসাবধানতাবশত আগুন লাগিয়ে ফেলছে। আবার পরিকল্পিতভাবে বনভূমি দখলের উদ্দেশ্যেও আগুন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগুনের উৎস শনাক্ত করতে ইতোমধ্যে পুরস্কার ঘোষণাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান বলেন, “একই সময়ে ১০-২০টি স্থানে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমরা নিয়মিত টহল, জিডি ও মামলাসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বনভূমিতে আগুন লাগলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরো তীব্র করে। আগুনে ধ্বংস হয় জীববৈচিত্র্য, হারিয়ে যায় বহু ওষুধি গাছ ও প্রাণীর আবাসস্থল।
এ বিষয়ে কথা হয় নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান মো. খোরশেদ আলম ও নদী পরিব্রাজক দল শ্রীপুর শাখার সভাপতি সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে। তারা জানান, প্রতিবছর একই ঘটনা ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই আগুনের চক্র থামানো সম্ভব নয়।
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন জানান, আগুন প্রতিরোধে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা আগামী মৌসুম থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে। তিনি বলেন, “সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বন রক্ষা সম্ভব নয়।”