চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮ দিনে কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৩টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) থেকে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ৯০টি শিশু। এসব শিশু জেলার পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তবে, কোনো শিশু মারা যায়নি।
মঙ্গলবার দুপুরে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনের কক্ষে এ তথ্য দেন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার।
তিনি বলেন, “৯০ শতাংশ শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে কুমারখালী ও দৌলতপুর উপজেলা হামের হটস্পট। ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে এ পর্যন্ত ১১টি পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। প্রথম রোগী ঢাকা থেকে এসেছিল।”
গত রবিবার খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মজিবুর রহমান কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, কুষ্টিয়ায় জেলায় প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ২০২৪ সালে গড়ে ৫ জন, ২০২৫ সালে ৩ জন ও ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে গড়ে ১৫ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগীর বয়স ৫ বছরের নিচে। তাদের অধিকাংশ হাম-রুবেলা টিকা পায়নি। জ্বর ও শরীরে লালচে দানা লক্ষণযুক্ত সব রোগীকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তিন সপ্তাহ ধরে হামের উপসর্গধারী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ১৯ শিশু রোগী চিকিৎসাধীন আছে। তবে, তাদের মধ্যে কেউ মারা যায়নি।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ২০ শয্যার শিশু ওয়ার্ড শতাধিক রোগীতে ঠাসা। বারান্দাতেও শিশুদের রাখা হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের আলাদাভাবে দোতলার একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। সেখানেও বিছানার ঘাটতি। কয়েকটি বিছানায় দুটি করে শিশু রোগী রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শিশুই জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। শরীরে ফোঁটা ফোঁটা র্যাশও আছে।
শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে বসে আছেন তাদের মা ও স্বজনরা। হামে আক্রান্ত তিন মাস বয়সী মেয়ে ফারিয়া খাতুনকে বিছানায় নিয়ে বসেছিলেন মিতু খাতুন। তার বাড়ি সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে। শনিবার মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করান।
মিতু খাতুন বলেন, তার (মা) ঠান্ডা জ্বর ছিল। এর পর মেয়ের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে। গায়ে র্যাশ দেখা দেয় প্রচুর। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। বেসরকারিভাবে এক চিকিৎসককে দেখানো পর হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা হয়। শ্বাসকষ্ট কমেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতালে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জসহ সবকিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। জ্বরের সিরাপ পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় একবার শুধু বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসক এসেছেন।
সদর উপজেলার আলামপুর গ্রাম থেকে এসেছেন নাজনীন আক্তার। তার তিন মাস বয়সী ছেলে ওরহানকে তিন দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করান।
নাজনীন আক্তার বলেন, “প্রথমে ছেলের জ্বর হয়। চার দিন ছিল। এরপর সারা শরীর ছোট ছোট র্যাশে ভরে যায়। পরে হাসপাতালে আনছি। এখন কিছুটা ভালো আছে।”
তিনিও অভিযোগ করেন যে, ২৪ ঘণ্টায় একজন চিকিৎসক শুধু সকালবেলায় আসেন। কুমারখালী থেকে আয়ান নামে এক শিশুকে চার দিন আগে ভর্তি করিয়েছেন মা অন্তরা খাতুন। তিনি বলেন, “একটা সিরিঞ্জও দেয় না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এমনকি, ফার্মেসিতে ওষুধ পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।”
রোগীর স্বজদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাম রোগীদের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স কামরুন্নাহার বলেন, “পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। স্টোর কক্ষের কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।”
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, “হামে আক্রান্ত রোগী ১৯ জন ভর্তি আছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট আছে। তবে, কোনো ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নেই। তিনজন রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্সের তত্ত্বাবধানে হাম রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।”
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগীরা আসছে। এসব হাসপাতালেও পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলায় ১৫ জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে দুজন পজিটিভ। ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ জন ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে পজিটিভ ছিল ২ জন। মার্চ মাসের ২৯ দিনে রোগী ভর্তি হয় ১২৮ জন। তাদের মধ্যে ১১ জন পজিটিভ রোগী। মোট ১৫ রোগী পজিটিভ শনাক্ত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয় ৯০ শিশু।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেছেন, “জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুরা আসছে। সব হাসপাতালে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ করা হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেছেন, “প্রত্যেক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলাগুলোতে কারো হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে সেবা নিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে এলাকায় মাইকিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”