নড়াইলের প্রবেশ মুখে সদর উপজেলার বর্নিবাজার এলাকায় সাইনবোর্ডে চোখে পড়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘স্বাগতম ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল জেলা’। তবে, শহরে প্রবেশ করলে দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। ভিক্ষুকমুক্ত বাক্যটি সাইন বোর্ডেই সীমাবদ্ধ। পুনর্বাসিত করা ভিক্ষুকদের একটি বড় অংশই আবার ফিরে এসেছেন এই পেশায়। শুধু তাই নয়, অন্য জেলা থেকেও ভিক্ষুক এসে ভিড় করছে নড়াইল শহরে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৭৯৮ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। জেলার তিনটি উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়নের ভিক্ষুকদের চিহ্নিত করে তাদের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, সেলাই মেশিন, ভ্যান, ছোট দোকান, ওজন পরিমাপক যন্ত্র, টিন ও নগদ অর্থসহ নানা উপকরণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে তহবিল গঠন করে ঋণ সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল। অনেক ভিক্ষুককে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনা হয়। কিন্তু, কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেই উদ্যোগের কার্যকারিতায় ভাটা পড়ে।
ভিক্ষুকরা জানান, পুনর্বাসন সমগ্রী ছিল অপর্যাপ্ত। তাদের অনেকেই অভাবের কারণে পুনর্বাসন সমগ্রী বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেকেই দাবি করেছেন, তালিকায় নাম না থাকায় পুনর্বাসন সমগ্রী পাননি তারা। যে কারণে বাধ্য হয়ে এই পেশায় থাকতে হচ্ছে তাদের।
বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সদর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে ভিক্ষা করতে দেখা যায় ফিরোজ কাজী নামে এক ব্যক্তিকে। তিনি হুইল চেয়ারে বসে ভিক্ষা করছিলেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যশোরের জামদিয়া ইউনিয়নের ভিটেবলা গ্রাম থেকে ভিক্ষা করতে এসেছেন।”
অন্য জেলার লোক এ জেলায় কেন জানতে চাইলে ফিরোজ কাজী বলেন, “নড়াইল জেলার ভিক্ষুক যশোর ভিক্ষা করেন। এলাকার ভিক্ষুককে এলাকার লোক ভিক্ষা দেয় না। তাই নড়াইল এসেছেন।”
বিকেলে নড়াইল জেলা শহরের রূপগঞ্জ বাজারে ভিক্ষা করতে দেখা যায় মির্জাপুর গ্রামের আছিরন নামের এক বৃদ্ধাকে। ২০১৭ সালে ভিক্ষা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার জন্য তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেছিল জেলা প্রশাসন। তার দাবি, তাকে শুধু ভাতার টাকা দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষায়, “ভিক্ষা না করলে পেট চলবে কীভাবে’।
শুধু এই দুজনই নয়, নড়াইল শহরের বাস টার্মিনাল, বিভিন্ন মার্কেট, ভিক্টোরিয়া কলেজ চত্বর, সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রেস ক্লাব চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ভিক্ষা করতে দেখা যায় অনেক ভিক্ষুককে।
নড়াইল বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আলিম বলেন, “যশোরের ধলগাঁ বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল প্রত্যেক হাটবারে নড়াইল গোহাটখোলায় নামে। সেখান থেকে তারা দল বেধে জেলা শহরে ভাগ হয়ে সারাদিন ভিক্ষা শেষে আবার একসঙ্গে ধলগাঁ চলে যান। ভিক্ষুকদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ।”
নড়াইল সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উত্তম কুমার সরকার বলেন, “ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে ভিক্ষুকদের চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা দিয়ে থাকি। অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে অন্য পেশায় গেছে। তবে, বাইরের জেলা থেকে ভিক্ষুক আসায় বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”