জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলার বাকি ২৮ আসামির মধ্যে ৩ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের মা-বাবা এবং সহপাঠীরা।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন— পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনেই গ্রেপ্তার আছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপাড়ায় নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের দেওয়া তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেছেন, “আজকের এই রায়ে দুজন পুলিশকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই। আমার মতে, এই মামলায় আরো কয়েকজনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়ার দরকার ছিল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সে দায়ী। অথচ, তার সামান্য সাজা দিয়েছে। তাই, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট না। ছেলেদের সাথে এবং আইনজীবীদের সাথে কথা বলে আমরা পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।”
আবু সাঈদ মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “আশা করেছিলাম, মূল হোতাদেরও ফাঁসি হবে, কিন্তু হলো না। আমরা চাইছিলাম, আসামির ফাঁসি হবে, কিন্তু তা না হয়ে জেল হলো। তাই, আমরা খুশি না।”
এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ও সহপাঠীরাও। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেছেন, “দুজন পুলিশ সদস্যের ফাঁসির রায় দিয়েছে। বাকিদের লঘু দণ্ড দিয়েছে। এতে আমরা অসন্তুষ্ট। যাদের লঘু দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তির বিষয়ে আদালত বিবেচনা করবেন বলে আমরা দাবি করছি।”
আরেক শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাক্ষী আরমান হোসেন বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম, পাঁচ-দশ বছর শাস্তি হবে না, সকলের যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, সেটি হয়নি। এতে আমরা হতাশ। আসামিদের ভূমিকা অনুযায়ী, তাদের সাজা অনেক কম হয়েছে। আদালত বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবেন বলে আশা করছি।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শওকাত আলী বলেছেন, “আবু সাঈদ হত্যা মামলার যে আজ রায় হয়েছে, এতে আমি সন্তুষ্ট। এই রায়ে আসামিদের শাস্তির মাত্রা নিয়ে তার সহযোদ্ধা এবং পরিবারের সদস্যরা ভালো বলতে পারবেন। এত প্রতীক্ষার পর আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা হলো, এটি ভালো দিক। আসামিদের শাস্তির মাত্রার বিষয়টি সাক্ষী এবং পরিবারের সাথে পর্যালোচনা করে বলতে পারব, সন্তুষ্ট কি না।”
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাকে হত্যার ভিডিও সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন আর পুলিশ তার বুকে একের পর এক গুলি করছে। এ হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় গণঅভ্যুত্থানের।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত বছরের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। যুক্তি-তর্ক শেষ হয় গত ২৭ জানুয়ারি।