রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলে নিবন্ধিত জ্বালানি তেলের পাম্প আছে ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০টি পাম্পে। বাকিগুলো বন্ধ। যে পাম্পগুলোতে তেল বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতে গ্রহকের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল থেকে মাত্র ৭টি পাম্পে তেল সরবরাহ করতে দেখা গেছে। বাকি পাম্পগুলো ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ গ্রাহক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আজ শুক্রবারে সম্ভব্য ১০টি পাম্পে তেল দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যখন কোনো ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল দেওয়া হবে বলে প্রচার করা হচ্ছে, সেখানে আগের দিন বিকাল থেকেই মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। তেল পাওয়ার আশায় চালকরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন রাস্তায়। তাদের অভিযোগ, সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এদিন সকালে নগরীর আফরিন পেট্রোলিয়াম পাম্পে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ, ভিআইপি লাইনে শুধু জরুরি সেবার গাড়ি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তেল দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে সাধারণ মানুষকেও তেল নিতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সাধারণ লাইনে অপেক্ষমাণ গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে পাম্প কর্মচারীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
তেল নিতে আসা এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, আর চোখের সামনে দিয়ে নিয়ম ভেঙে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাম্প মালিক আর প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে এই বিশৃঙ্খলা।
মোটরসাইকেল চালকরা জানান, রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এতে তাদের দৈনন্দিন কাজ ও জীবিকা নির্বাহে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে পেশাজীবী চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী নগরীর নওদাপাড়ায় অবস্থিত লতা ফিলিং স্টেশন। বুধবার (৮ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৫০০ মোটরসাইকেল তেল নিতে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছে। এই পাম্পে তেল দেওয়া শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে।
মোটরসাইকেল চালক নোমান ইসলাম বলেন, ‘‘তেল নিয়ে খুব সমস্যায় আছি। কোম্পানিতে চাকরি করে তেলের জন্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আবার তেল না নিতে পারলে কাজ করতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে চাকরি থাকবে না, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। তীব্র রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না। আবার রাতে এসেও তেল পেতে পেতে পরদিন দুপুর হয়ে যাচ্ছে।’’
আরেক চালক ইব্রাহিম আলী বলেন, ‘‘৩০০ টাকার তেল নিতে কয়েক ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। কর্মঘণ্টার হিসাব করলে এক লিটার তেলের দাম পড়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। তেলের কারণে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে পারছি না। সকালে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তেল না পেয়ে অফিসে গেছি। পরে ছুটি নিয়ে আবার এসে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছি। তেলের নির্দিষ্ট একটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে কাজের জন্য সুবিধা হয়।’’
এদিকে তেলের জন্য চাষিরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। তারা শ্যালোমেশিন নিয়ে পাম্পে আসছেন। বালানগর, কালচিকার বোরো চাষি কালাম ও কোরবান আলী বলেন, ‘‘তেল পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়িতে পানি তোলা মটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। কোন কোন সময় জমিতে পাইপ বিছানোর পরে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ নেই। এ সময় ঠিকমত জমিতে সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতি হবে।’’
‘‘দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো মাঠে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থার ওপর,’’ তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মাথায় করে শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে এসেছেন রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেলে খুব বেশি হলে তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। আমার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। যেহেতু তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এভাবে প্রতিদিন কষ্ট করে তেল কিনে সেচ দিতে হচ্ছে।’’
তার দাবি, যারা বোরো ধানের জমিতে সেচ দেবেন তাদের কমপক্ষে ৪০০-৫০০ টাকার তেল দেওয়া উচিত।
পাম্প মালিকরা জানান, সড়কপথে তেল পরিবহনে খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। এতে তেল বিক্রি করে লাভ একেবারেই কমে গেছে। তারা আবারও খুলনার দৌলতপুর ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করার দাবি জানান।
পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিএলসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘আগে পাম্পগুলোয় যে তেল সরবরাহ করা হতো, এখনো প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বিপিসি দৌলতপুর থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’’
রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, ‘‘তেল উত্তোলনকারী কোম্পানি বা ডিপো থেকে চাহিদানুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। আমাদের হাতে তেল নেই, তাই আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের কিছুই করার নেই।’’
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘তেলের জন্য আমরা ফুয়েল কার্ড চালু করছি। যাদের তেল প্রয়োজন তারা তেল পাবেন। রাজশাহীর বাইরে থেকে অনেকে এসে তেল নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকে তেল থাকা সত্বেও তেল নিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আশাকরি প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই তেল পাবেন।’’