গ্রামের পাকা সড়ক দিয়ে শতাধিক মানুষ জোরে হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এর কয়েক মিনিট পর মিছিলকারীরা আস্তানায় পৌঁছে হামলা চালায়। শুরু করে ভাঙচুর। পাকা ঘরের ভেতর ঢুকে ভাঙচুর চালিয়ে ধরিয়ে দেয় আগুন।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে আস্তানায় হামলা চালিয়ে এক ‘পীর’কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে এমন দৃশ্য।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে হামলার ঘটনাটি ঘটে।
আরো পড়ুন: কুষ্টিয়ায় আস্তানায় হামলা-আগুন, ‘পীর’কে পিটিয়ে হত্যা
নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর। তিনি ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা। হামলার ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও এক নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, শামীমের আস্তানায় প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনা হয়। ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। তখন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি আবার একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
স্থানীয়রা জানান, শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে। বেশ কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, ৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার থেকেই স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শনিবার সকালে শামীমের আস্তানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট নামে এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, দুপুরের পর আস্তানায় হামলা চালানো হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, খবরটি স্থানীয় প্রশাসনসহ পুলিশ প্রশাসনের কাছে চলে যায়। সকাল থেকে সেখানে পুলিশও ছিল। জোহরের নামাজের পর এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সী লোকজন লাঠি, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে আস্তানার দিকে রওনা দেন। এরপর সেখানে গিয়ে হামলা চালান। আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে সেখানে তাণ্ডব চালানো হয়। আস্তানায় থাকা কয়েকজন আহত হন। অনেকে প্রাণ ভয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যান।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান বলেন, “দুপুরে আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে শামীম নামের ব্যক্তির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাকে কোপানো হয়েছে। চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি মারা যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদের মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তারা শক্তামুক্ত।”
পুলিশ জানায়, অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হলেও লোকজন এত বেশি ছিল যে, তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ব্যক্তির (শামীম) একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তাতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া রয়েছে। কিন্তু, ভিডিওটি অনেক আগের। ভিডিওটি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকার মানুষ সেখানে হামলা চালান। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন রয়েছে। কারা কীভাবে ভিডিওটি নতুন করে সামনে নিয়ে এল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, “আস্তানার পেছনের দিকে বাঁশবাগান। ধারণা করা হচ্ছে, পেছন থেকেই সহস্রাধিক মানুষ এসে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এত মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।”
কে এই শামীম রেজা: স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম সেখানকার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। এ সময় থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে এসে পৈতৃক জমিতে ওই আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাকে দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।