মাটির সঙ্গে মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে ভাবে জড়িয়ে আছে। এর অন্যতম উপাদান মাটি। মাটি দিয়ে তৈরি যাবতীয় ব্যবহার্য এবং শৌখিন শিল্পসামগ্রীই হচ্ছে মৃৎশিল্প। শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে মৃৎশিল্প অতি প্রাচীন। মাটি যখন শিল্পের ছোঁয়া পায় তখন উঠে আসে ঘরে, সাজিয়ে তোলে আমাদের অন্দরমহল। সেই মাটির তৈরি সামগ্রী যখন ব্যাপক প্রসার লাভ করে, তখন তার নাম হয় মৃৎশিল্প।
খুলনাঞ্চলে কালের আবর্তনে বিলীনের পথে ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প। বিশেষ করে প্লাস্টিকের খেলনা সামগ্রীর ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে শিল্পটি। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ কেউ পূর্বপুরুষের এই পেশা এখনও ধরে রেখেছেন। করছেন প্রাণান্তকর চেষ্টাও।
পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে জমে উঠেছে খুলনার দিঘলিয়া, ডুমুরিয়া ও পাইকগাছা উপজেলার পালপাড়া। মাটির শিল্পকর্ম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কারিগররা।
মাটির ফলের ব্যাংক, পুতুল আর নানান খেলনা। সবই তৈরি হচ্ছে দক্ষ হাতে। এরপর রঙের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় এসব শিল্পকর্ম।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে যুক্ত এই কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা। নিরলস পরিশ্রমে এগিয়ে চলছে বৈশাখের প্রস্তুতি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চিত্র। আগের মতো আর নেই বিক্রি, কমে গেছে চাহিদা।
এক সময় খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি পালপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই জড়িত ছিল এই পেশায়। এখন সেই সংখ্যা কমে এসেছে অনেকটাই। জীবিকার তাগিদে অনেকে ছেড়েছেন বাপ-দাদার পেশা। কেউ দিনমজুর, কেউ বা অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবুও নাড়ির টানে, ঐতিহ্যের টানে, হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার এখনও ধরে রেখেছেন এই শিল্প। সংগ্রামের মাঝেও থেমে নেই তাদের হাত। বৈশাখী মেলায় বিক্রির আশায় তৈরি হচ্ছে প্রতিটি শিল্পকর্ম।
ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পালপাড়ার কারিগররা। প্রয়োজন শুধু পৃষ্ঠপোষকতা আর ক্রেতাদের আগ্রহ, তবেই হয়তো ফিরে আসবে হারানো দিন।
খুলনার পাইকগাছায় মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক, আগরদানি, মোমদানি, প্রদীপ দানি, বাচ্চাদের খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে, সে কারণে বংশানুক্রমে পাওয়া এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসঙ্গতি আর জীবন-মান উন্নয়নের জন্য ক্রমশ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন তারা। এমনকি মাটির তৈরি তৈজসপত্রের পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় নতুন করে এ পেশায় কেউ প্রবেশ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। আবার কেউ কেউ জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। বোয়ালিয়া পাল পাড়ায় কয়েকটি পরিবার মৃৎশিল্পের কাজ করেন। বাড়ির উঠান জুড়ে মাটির জিনিস পত্র। ভোর থেকে শুরু করে মধ্যে রাত পর্যন্ত চলছে তাদের এ ব্যস্ততা। হাড়ি-পাতিল, মশার কয়েলদানি, সানকি, কলসি, ফুলের টপ থেকে শুরু করে শিশুদের খেলনা পুতুল, হাতি, ঘোড়া, ময়ূরপাখি, নৌকা,পাতিল, জগ, কলসি, চুলা বিভিন্ন খেলনা রং করতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা।
মৃৎশিল্পী সাধনা রানী পাল বলেন, প্লাস্টিকের জন্য মাটির খেলনা আগের মতো বিক্রি হয় না। তবে গদাইপুর মাঠে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলাতে মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র ও ছোটদের খেলনার চাহিদা থাকে। মেলায় বেঁচাকেনা ভালো হয়।
বোয়ালিয়া পাল পাড়ার মৃৎশিল্পী রবীণ পাল বলেন, ‘‘আমার বাপ-দাদার জাত ব্যবসা ধরে রাখার জন্য আমি ৩০ যাবৎ বছর এ পেশায় কাজ করছি। আমার পরিবারের আর কেউ এই পেশায় আসতে চাচ্ছে না। দিনে দিনে মাটির তৈরী জিনিসপত্রের চাহিদাও কমছে, বর্তমানে স্যানিটারি ল্যাট্রিনের চাক বা রিং বা কুয়ার রিং তৈরি করছি।’’
মৃৎশিল্পী হরিপদ পাল বলেন, ‘‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ পেশার শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সরকারি পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে মাটির জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয়তা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরা দরকার। তা না হলে মৃৎশিল্পীদের স্থান হবে শুধুই ইতিহাসের পাতায়।’’
ডুমুরিয়া উপজেলায় উপযুক্ত মাটির অভাবসহ আসবাবপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে অনেক পাল পরিবার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে ঝুঁকে পড়েছেন। যে কারণে ভিন্ন জেলা থেকে ক্রয়কৃত বাহারি নকশার মাটির পণ্য শোভা পাচ্ছে দোকানগুলোতে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নববর্ষের পণ্য তৈরি নিয়ে তেমন ব্যস্ততা নেই ডুমুরিয়ার মৃৎশিল্পীদের। তাদের কারখানাগুলোতে এখন আর দেখা মিলছে সেই নান্দনিক নকশার মাটির পণ্য। তবে ভিন্ন জেলার বাহারি নকশার পণ্য জিক জাগ করছে ডুমুরিয়ার পালদের দোকানে। মাটির পণ্যের মধ্যে রয়েছে পান্তা-ইলিশের থালা, রঙিন কলস, মাটির ব্যাংক, বাহারি খেলনা, ফুলদানি, আলমারি, ডিনার সেট, শোপিস ও ঘরোয়া তৈজসপত্র। দোকানগুলোতে ব্যাপক বেচা-কেনা শুরু হয়েছে।
বৈশাখির উপযুক্ত মাটির অভাব ও আসবাবপত্রের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় বাংলা নববর্ষের মেলাকে ঘিরে ডুমুরিয়ার মৃৎশিল্পীদের মধ্যে নেই কোনো ব্যস্ততা। মাটির পণ্যের দোকানে শিশু থেকে শুরু করে সব ধরনের মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উপজেলা সদর ও রানাই পালপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ডুমুরিয়ার ৫/৬টি স্থানে তৈরি হয় মাটির তৈজসপত্র। কিন্তু উপযুক্ত মাটির অভাবে এসব কারখানাগুলোতে দৃষ্টিনন্দন কোনো পণ্য তৈরি করতে পারছে মৃৎশিল্পীরা। শুধু গতানুগতিক মাটির হাঁড়ি-কলসিসহ কিছু তৈজস পণ্য তৈরি করছে। তবে ক্রমান্বয় মাটির তৈরির পণ্যের উপর চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কারু শিল্পীরা।
রানাই গ্রামের সঞ্জয় পাল জানান, একটা সময় পালেরা মাটির পণ্য তৈরি করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এখন বাপ দাদাদের পেশা ছেড়ে এখন অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণ উপলক্ষ্যে পালদের তৈরি পণ্যের চাহিদা এখনো অনেক আছে।
মৃৎশিল্পী রুপক পাল জানান, এখন আগের চেয়ে মাটির পণ্য ক্রয় হচ্ছে। তবে ব্যাবসা খুব ভালো যাচ্ছে না। প্লাস্টিকে পণ্যের কারণে বাজারে মাটির তৈরির পণ্যের চাহিদা অনেক কমে গেছে। তবে কিছু মানুষ এ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। আবার কেউ পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
ডুমুরিয়া বারোআনি বাজারের অরুণ পাল জানান, মাটির পণ্যের চাহিদা এখন বাড়তে শুরু করেছে। তবে নববর্ষকে ঘিরে দৃষ্টিনন্দন মাটির পণ্য কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, বাউফল, ঝালকাঠি, বরিশাল ও পিরোজপুরসহ বিভিন্ন এলাকা দেখে ক্রয় করে ডুমুরিয়ায় এনে বিক্রি করছি।
সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মৃৎশিল্পীদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে সরকারিভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ঋণদান কর্মসূচীসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচী আরও বেগবান করার চেষ্টা করবে উপজেলা প্রশাসন।
এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক মিজ হুরে জান্নাত এ প্রতিবেদককে বলেন, এ ব্যাপারে অবশ্যই সরকারের উদ্যোগ রয়েছে। এছাড়াও মাটির তৈরি পণ্যের বাজারজাতসহ তাদের জন্য আরো ভালো কী করা যায়, সে বিষয়ে দেখা হবে।