চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দু-একদিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে উৎসব চলে। এই উৎসব ঘিরে পাহাড়ে চলে নানা আয়োজন। চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু শেষ হতে না হতে শুরু হয় ত্রিপুরাদের বৈসু এবং এরপর মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই। এই উৎসবে মেতে উঠে সবাই।
সাংগ্রাই উপলক্ষে আজ বুধবার (১৫ এপ্রিল) খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ জলোৎসব, কনসার্ট, পিঠা উৎসব, মেলার আয়োজন করে।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চিংম্ররম বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই জলোৎসব হয়েছে। পুরনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি ও জরাজীর্ণ ধুয়ে-মুছে নতুন বছর শুদ্ধতা কামনায় তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠে জলোৎসবে। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হওয়া জলোৎসবের এই আয়োজন এবার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে।
সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক উথোয়াই মং মারমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এমপি।
উদ্বোধনকালে পার্বত্য মন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সামাজিক উৎসবের মাধ্যমে এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সাংগ্রাই এখন শুধু মারমাদের নয়, এটি পাহাড়ের সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে।
পার্বত্য মন্ত্রী বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সামাজিক উৎসবগুলো কেবল আনন্দ আয়োজনের মাধ্যম নয়, বরং এগুলো ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বলেন, সাংগ্রাই হলো মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। এই উৎসব ঘিরে এখানে সকল ধর্ম, বর্ণ জাতিগোষ্ঠীর মিলন ঘটেছে। এদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। সকলে মিলে-মিশে সকল জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সকালে মারমা জনগোষ্ঠীর শত শত নারী-পুরুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। বাদ্যের তালে তালে শোভাযাত্রাটি এলাকার প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে জলোৎসব শুরু হয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর একদিকে মারমা তরুণী অপর দিকে তরুণরা মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় পানি ভর্তি করে রাখা হয়। এরপর বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে চলে পরস্পকে পানি ছিটানো। এভাবে এক দলের খেলা শেষে আরেক দলের খেলা শুরু হয়।
জনশ্রুতি আছে, জলকেলি উৎসবের মাধ্যমে মারমা তরুণ-তরুণীরা একে-অন্যের সাহচর্যে আসার সুযোগ পায়। এ সময় তারা তাদের প্রিয় মানুষটিকে বেছে নেওয়ার কাজটিও সেরে নেন। সাংগ্রাই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পানি খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর উৎসবস্থলে সমবেত হন।
সাংগ্রাই মূলত মারমাদের উৎসব হলেও পার্বত্য জেলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, এমনকি বাঙালিরাও এতে যোগ দেয়। ফলে এটি আর মারমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাংগ্রাই উৎসব পরিণত হয় পাহাড়ি-বাঙালির মিলনমেলায়।
সাংগ্রাই উৎসব উপলক্ষে গত ১৩ এপ্রিল হতে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিন বিহার প্রাঙ্গণে বৈশাখী মেলা বসেছে। ব্যবসায়ীরা নানা প্রকার পসরা নিয়ে বসে বসেছেন। এছাড়া নববর্ষকে ঘিরে বিহারে দায়ক দায়িকারা বৌদ্ধ পূজা, বৌদ্ধ মূর্তিকে স্নান, বয়স্কদের স্নান করানোসহ নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা সদরেও সাংগ্রাই উৎসব উপলক্ষে জলোৎসব, ওপেন কনসার্ট ও পিঠা উৎসব হয়েছে।
বিকাল ৪টায় মারমা ছাত্র ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে জেলা সদরের গোলাবাড়ী এলাকার মহিলা কলেজ সংলগ্ন মাঠে এ আয়োজন হয়। উৎসবস্থলে মারমা তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে অংশ নেয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জলোৎসব, ওপেন কনসার্ট, ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব। নয়টি স্টলে পরিবেশন করা হয় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। এর মধ্যে বিখ্যাত ‘পইংজারা’ পিঠাও ছিল। এই পিঠা চাউল গুড়া, দুধ, নারিকেল, বাদাম, কিসমিসসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়। এটা দেখতে পায়েসের মতো। অনুষ্ঠানে আসা অতিথি ও দর্শনার্থীদের মাঝে এ পিঠা বিতরণ করা হয়।
এর আগে উৎসবের অংশ হিসেবে মারমা তরুণ ও তরুণীদের অংশগ্রহণে জলোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ম্রাসোথাই মারমা।