সারা বাংলা

মৌলভীবাজারের দুটি স্লুইস গেট যেন কৃষকদের গলার কাঁটা

মৌলভীবাজারের রাজনগরে প্রশাসনের গাফিলতিতে ভেস্তে গেছে একটি সেচ প্রকল্প। চাষাবাদ বাড়ানোর লক্ষ্যে শুকনা মৌসুমে পানি সরবরাহের জন্য নির্মাণ করা দুটি স্লুই গেট এখন স্থানীয় কৃষকদের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। ১০ বছর ধরে বন্ধ থাকায় কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না পাহাড়ি ধামাইছড়াতে নির্মিত স্লুইস গেটগুলো। বিকল্প উপায়ে পানির চাহিদা পূরণ করতে খরচ করতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ওই দুটি স্লুইস গেট। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও তদারকির অভাবে সেগুলো এখন কৃষকদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে পানি সরবরাহের পাইপ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বোরো ও রবি মৌসুমে ফসলি জমির পানির চাহিদা মেটাতে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নের বড়দল ও চাঁনভাগ এলাকায় নির্মাণ করা হয় দুটি স্লুইস গেট। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ধামাইছড়ার ওপর এ দুটি গেট নির্মাণ করা হয়। কিন্তু, এক মৌসুমেও এগুলো কাজে লাগেনি কৃষকদের। ১০ বছরেও সেগুলো সচল করার উদ্যোগ নেননি কেউ।

সম্প্রতি বড়দল গ্রামে গেলে কথা হয় স্থানীয় কৃষক নিয়ামত মিয়া, অনিক দাস, রসুন মিয়া, তেরাব আলী, বাতির আলীসহ কয়েকজনের সঙ্গে। 

তারা জানান, ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে স্লুইস গেট নির্মাণের পর ধামেশ্বরী ক্ষুদ্র পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ওই সমিতির কাছে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্লুইস গেট হস্তান্তর করে কর্তৃপক্ষ। উদ্বোধনের ৬ মাসের মাথায় ২০১৬ সালের মে মাসে প্রবল বেগে আসা পাহাড়ি ঢলে ভেঙে যায় বড়দল এলাকার স্লুইস গেটের দক্ষিণ পাড়। অতিবৃষ্টির কারণে পানির  চাপে পার্শ্ববর্তী টিলাও ধ্বসে পড়ে। স্লুইস গেটের নিচ দিয়ে প্রবাহিত না হয়ে নতুন পথ তৈরি করে নিয়েছে পাহাড়ি ছড়াটি। 

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে চাঁনভাগ এলাকায় নির্মিত স্লুইস গেটে। সেখানেও গেটের পশ্চিম পাড় ভেঙে নতুন পথে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। নির্মাণের পর এক মৌসুমেও গেট দুটির সুফল পাননি কৃষকরা। ফলে, বাধ্য হয়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ব্যয়ে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে ফসল চাষ করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

মুঠো ফোনে কথা হয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ শাহিদুজ্জামান ছালিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এই প্রকল্প এলাকার কৃষকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কাজে আসছে না।”

চাঁনভাগ গ্রামের কৃষক কুতুব আলী বলেন, “গেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকার সুযোগে পানি বিতরণের জন্য স্থাপিত পাইপ কেটে নিয়েছে চোরেরা। গেটের কপাট বন্ধ থাকায় নিচে পলি জমেছে। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বেশি থাকে।”

ধামেশ্বরী ক্ষুদ্র পানিসম্পদ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিক বলেছেন, “অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণের কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে গেট দুটি। এগুলো মেরামতের ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না কৃষকরা।”

রাজনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুল গনী বলেছেন, “আমি এখানে নতুন এসেছি। জাইকার অর্থায়নে ধামাইছড়ার ওপর নির্মিত স্লুইস গেট সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি। এগুলো মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব।” 

এই স্লুইস গেট দুটি ব্যবহার উপযোগী করা হলে উত্তরভাগ ইউনিয়নের ভুরভুরির বিল, ফাটা বিল, পশ্চিম চাঁনভাগ, র্পূব চাঁনভাগ, বড়দল, উত্তরভাগ, হায়পুর, উদয়রামপুরসহ হাওর এলাকার নিম্নাচঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার একর জমিতে সহজে ও কম খরচে ফসল চাষ করতে পারবেন কৃষকরা। এতে অনেক পতিত জমিও চাষাবাদের আওতায় আসবে বলে মনে করেন কৃষকরা।