সারা বাংলা

‘গাড়ি চললে পেট চলে, না চললে বন্ধ’

“আমার কর্মজীবনে তেলের এমন ভোগান্তি আমি দেখিনি। তেল না পাওয়ার কারণে আমরা শত শত ড্রাইভার-হেলপার বেকার বসে আছি। বাজার বন্ধ আছে দুইদিন থেকে। বাস না চললে তো আর মালিক ট্যাকা দিবে না। অন্য কোনো কাজেরও সুযোগ নেই যে, সেটা করে পরিবার চালাব।” হতাশা আর ভবিষ্যৎ আতঙ্ক নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের হেলপার আসাদ মিয়া।

তিনি আরো বলেন, “আবার যেসব বাস-ট্রাক মালিকের নিজস্ব তেল পাম্প আছে তারা ঠিকই তাদের গাড়ি চালু রেখেছেন। যাদের নেই, তারা পেটে পাথর বেঁধে আছেন।”

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে তীব্র ডিজেল সংকটে গাইবান্ধায় বন্ধ হয়ে গেছে এক তৃতীয়াংশ বাস-ট্রাক। এতে এসব পরিবহনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত শতশত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

বাস-ট্রাক মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক সমিতি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গাইবান্ধা জেলায় এ মুহূর্তে ১৫০ এর বেশি বাস রয়েছে। এরমধ্যে গাইবান্ধা-ঢাকা-চট্টগ্রাম ১২৫টি এবং ২৫ থেকে ৩০টি আন্তঃজেলা বাস রংপুর-বগুড়া যাতায়াত করে। তেল সংকটের কারণে বর্তমানে ঢাকা রুট ও আন্তঃজেলা রুটে প্রায় ৫০টির মতো বাস নিয়মিত চলাচল করতে পারছে না।

জেলায় রেজিস্ট্রেশনকৃত মোট মোটর শ্রমিক আছে প্রায় ৬ হাজার। প্রতিটি বাসে হেলপার, ড্রাইভার ও সুপারভাইজার ৩ জন থাকেন। সেই হিসাবে শুধু বাস থেকেই ১৫০ জন শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হওয়ায় গোটা পরিবারে সংসারের চাকা সচল রাখা তাদের জন্য  কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলায় ট্রাক আছে প্রায় ১০০০টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজেল সংকটে ৩৫-৪০ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ চলাচল এখন প্রায় বন্ধের পথে। এক সপ্তাহ ধরে সংকট ক্রমে বেড়েই চলছে। তেলের দাম বৃদ্ধি হলেও তেলের সরবরাহ বাড়েনি।

সদরের খোলাহাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা লিংকন প্রায় ১২ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমার কর্মজীবনে তেলের এমন ভোগান্তি আমি দেখিনি।”

গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের বি এম ক্লাসিক পরিবহনের ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলেন, “গাড়ি না চললে আমাদের পেটও চলে না। এক মাস ধরে এভাবেই চলছে। একদিন তেল পেলে পরেরদিন তেল পাওয়া যায় না। একটি গাড়ির তেলের জ্বালানি ৮ থেকে ১০টি পাম্প থেকে সংগ্রহ করতে হয়। মালিকের কামাই না হলে হেলপার, ড্রাইভার সবার আয় বন্ধ। গাড়ি চললে পেট চলে, না চললে বাজার বন্ধ। তেলের অভাবে এখন ট্রার্মিনালে অনেক গাড়ি অলস পড়ে আছে।”

সাঘাটা উপজেলার বাস মালিক সোহরাব মিয়া বলেন, “আমার বাসটি ঢাকা থেকে গাইবান্ধা আসার কথা ছিল সকালে। তেলের অভাবে সেটি দুইদিন পর ঢাকা থেকে এসেছে। প্রতিদিন ৩ থেকেই ৫ হাজার টাকা করে বাস ভাড়া আয় করতাম। কিন্তু তা এখন বন্ধ। কারণ ডিজেল নেই। খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাইবান্ধা বাস-ট্রাক মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, “কিছু বাস মালিকরা এদিক থেকে বেশ ভালো আছেন। কারণ তাদের নিজস্ব পাম্প আছে। যাদের নেই, তারা বেকায়দায় আছেন। তেল সংগ্রহ করতে লাইনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও শেষে তেল পাইনি। আমাদের গাড়ি দুদিন ধরে বসে আছে।”

গাইবান্ধা মোটরযান পরিদর্শক কমাল আহমেদ কাজল জানান, জেলায় বাস, ট্রাক,  মোটরসাইকেলসহ নিবন্ধিত মোট ৫০ হাজার ৬৫৭টি গাড়ি রয়েছে। শুধু মোটরসাইকেল রয়েছে ৫০ হাজার ২০টি। এরমধ্যে হ সিরিজের মোটরসাইকেল ৩৯ হাজার ৫৫৬টি (৫১–১২৫ সিসি), ল সিরিজের ১০ হাজার ৩১টি  (১২৫ সিসির উপর) এবং এ সিরিজের ৪৩৩টি (৫০ সিসির নিচে) মোটরসাইকেল রয়েছে। 

ফিলিং স্টেশন সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার লিটার পেট্রোল, ৪ হাজার লিটার অকটেন এবং ৩২ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ এসেছে তার অর্ধেকেরও কম। 

পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, “জেলার সাত উপজেলার ২২টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। পাম্প থেকে আমরা ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের যে চাহিদা পাঠাই, ডিপো থেকে দেওয়া তার অর্ধেক বা তারও কম। আবার একদিন তেল পাওয়া না গেলে পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।”

গাইবান্ধা ট্রাক মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, “জেলার সাত উপজেলায় ট্রাক আছে প্রায় এক হাজার। আবার অনেক ব্যবসায়ীর ৭ থেকে ৮টি করে ট্রাক আছে। তেল সংকটের কারণে এসব ট্রাকের মধ্যে দুটি একটি করে মাঠে পণ্য আনা নেওয়া করছে। তেল সংগ্রহ করতে না পেরে বাকি ট্রাকের হেলপার ও ড্রাইভারদের বাধ্য হয়ে বসে থাকতে হয়।”

গাইবান্ধা জেলা বাস-ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বাদশা মিয়া বলেন, “একটি বাস-ট্রাকের পেছনে ড্রাইভার, হেলপার ছাড়াও লোড-আনলোড কাজে জড়িত থাকেন আরো পাঁচ-সাতজন শ্রমিক। জেলায় বাস ট্রাকের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এছাড়া ,মাছ, মাংস, শাকসবজি, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, মরিচ উৎপাদন, বিপণন এবং মেরামত ও যন্ত্রপাতির ব্যবসাসহ অন্যান্য কাজের সঙ্গে জড়িতদের হিসেব ধরলে আরো বহু শ্রমিকের হিসাব মিলবে। কাজ হারিয়ে শতশত শ্রমিক পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।”

এ ব্যাপারে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সংকটের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”