কিশোরগঞ্জের ভৈরবে চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের ফাঁকা জায়গায় পড়ে যায় এক বছর বয়সি একটি শিশু। সন্তানকে বাঁচাতে বাবাও চলন্ত ট্রেন থেকে ওই ফাঁকা জায়গায় ঝাঁপ দেন। ছেলে মাথা চেপে ধরে পাথুরে খোয়ার ওপর সেঁটে থাকেন বাবা। তাদের ওপর দিয়ে ঝিক ঝিক করে একে একে চলে যায় আটটি বগি। অবশ্য অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যান তারা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে এই ঘটনার সাক্ষী হয় কয়েকশ যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দা। অনেক কণ্ঠে শোনা যায়, ‘আল্লাহ আল্লাহ’। অনেককে দোয়া পড়তে শোনা গেল। চলন্ত ট্রেনের যাত্রীরা উদ্বেগে চিৎকার করছিলেন।
এই ঘটনার একটি ভিডিও রাইজিংবিডি ডটকমের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ছেলেটির বাবার হাতে ও কাঁধে ক্ষতের দাগ। তবে তিনি একই সোজা হয়ে দাঁড়ান। এসময় ওই বাবাকে খানিকটা নির্বাক দেখায়; যেন তার কিছু বলার ভাষা নেই।
ট্রেনটি যেতে না যেতেই ছুটে এসে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় তার মাকে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে বলেছেন, ট্রেনে নিচে পড়ে এভাবে বেঁচে যাওয়ার দৃশ্য তারা জীবনেও আর দেখেনি।
দুর্ঘটনার শিকার বাবা-ছেলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তাদের সঙ্গে ছিলেন ছেলেটির মা। তারা ব্রাহ্মণবাড়ি থেকে ভৈরবে আসেন। ছেলেটির মাকে ট্রেন থেকে নিরাপদে নামিয়ে আনেন প্ল্যাটফর্মে থাকা লোকজন।
ঘটনার পরপরই তারা স্টেশন থেকে চলে যাওয়া পরিবারটির সঙ্গে কথা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা অভিমুখী তিতাস কমিউটার ট্রেনটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরিতে ভৈরব স্টেশনে পৌঁছায়। যাত্রাবিরতির সময় ওই দম্পতি সন্তানসহ ট্রেন থেকে নামতে পারেননি। ট্রেনটি ছেড়ে দেওয়ার পরপরই তাড়াহুড়া এক বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে নামার চেষ্টা করেন বাবা। এসময় হাত ফসকে শিশুটি প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে যায়।
সন্তানকে বাঁচাতে সঙ্গে সঙ্গে বাবাও ঝাঁপ দেন ফাঁকার মধ্য দিয়ে। ছেলেকে হাতের নাগালে পেয়ে তার মাথা চেপে ধরে প্ল্যাটফর্মের দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে শুয়ে থাকেন। লাইনে ট্রেনের চাকা ও বাবা-ছেলের মধ্যে মাত্র ৬ ইঞ্চির মতো ফাঁকা জায়গা ছিল। ওই অবস্থায় তাদের ওপর দিয়ে আটটি বগি চলে যায়। ট্রেনটি চলে গেলে বাবা-ছেলেকে টেনে তোলেন লোকজন।
তিতাস কমিউটার ট্রেনের কাউন্টারম্যান ফালু মিয়া জানিয়েছেন, অসতর্ক অবস্থায় চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে শিশুটি নিচে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তার বাবাও লাফিয়ে নামেন এবং ছেলেকে বুকে আগলে রেললাইন ও প্ল্যাটফর্মের ওয়ালের মাঝে শুয়ে থাকেন। তাদের ওপর দিয়ে আটটি বগি চলে গেলেও তারা অক্ষত ছিলেন।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইয়িদ আহম্মেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, “বাবা-ছেলের ওপর দিয়ে আটটি বগি পার হলেও তারা অক্ষত থাকাটা আল্লাহর অসীম দয়া ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা করার সময় যাত্রীদের অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।”