সারা বাংলা

নেত্রকোণায় ৯৫৬৫ হেক্টর ধানক্ষেত পানিতে প্লাবিত 

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নেত্রকোণার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা বোরো ধান শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকেরা। পানি বাড়া অব্যাহত থাকলে অকাল বন্যায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে কংশ ও ভোগাই নদীর পানি জারিয়া–জাঞ্জাইল এলাকায় বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ওইসব এলাকায় ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদীর পানি জনবসতি এলাকায় প্রবেশ না করলেও তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। পানি আরো বাড়লে তা বন্যায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খালিয়াজুড়ির ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সুমেশ্বরী, মগড়া ও ধলা–উব্দাখালীসহ জেলার অন্যান্য বড় নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, জেলায় ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৫৬৫ হেক্টর ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে কলমাকান্দা উপজেলায় টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে উব্দাখালী, ভুগাই ও মহাদেব নদীর পানি বেড়ে কয়েকটি হাওর ও বিলে ঢুকে পড়েছে। এছাড়া আটপাড়া উপজেলার মশাহাতী, সুমাইখালী এবং পূর্বধলার জারিয়া এলাকার পাকলা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে গেছে। এতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটছেন, যাতে অন্তত আংশিক ফসল রক্ষা করা যায়।

আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী এলাকার কৃষক সাজিদ মিয়া বলেন, ‘‘টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জমি তলিয়ে যাওয়ায় অর্ধপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছি। শ্রমিকও পাচ্ছি না। পাইলেও টাকা বেশি লাগে৷ এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনো অর্ধেক ফসল কাটা বাকি।’’

জেলার খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলা হাওর অধ্যুষিত। এ সব এলাকার মানুষের প্রধান জীবিকা বোরো ধান চাষ। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমি হাওরাঞ্চলে। মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ৬৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ ধান কাটা হলেও জেলার হিসাবে তা ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

খালিয়াজুরির জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক তারা মিয়া বলেন, ধনু নদে পানি বাড়ার প্রবণতা থামছে না। হাওরের নিচু জমি ও বাঁধসংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পানি জমে গেছে। এখনো প্রায় অর্ধেক জমির ধান মাঠেই রয়ে গেছে, যা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ খেতে ধান পেকে গেলেও জমিতে পানি জমে থাকায় কাটতে সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা। অনেক স্থানে কম্বাইন হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে শ্রমিকসংকট যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। বাড়তি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

খালিয়াজুরির বিভিন্ন হাওরের অনেক স্থানে বাঁধের কাছাকাছি পানি পৌঁছে গেছে। এতে কৃষকদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

বজ্রপাতের ঝুঁকিও কৃষিকাজে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে মাঠে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ধান কাটার কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংশ ও ভোগাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ধনু নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সামনের দিনগুলোতে তা বাড়তে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ফসলরক্ষা বাঁধগুলো স্বাভাবিক রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে হাওরের পরিস্থিতি সহনীয় থাকলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কৃষকেরা যাতে দ্রুত ধান কাটতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।