সারা বাংলা

ঝকঝকে দালান আছে, নেই কাঙ্ক্ষিত সেবা

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ভাবলা গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ চায়না বেগম নামের এক রোগীকে মঙ্গলবার দুপুরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার দুপুর পর্যন্ত তার তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় তাকে বাড়ি নিয়ে যায় স্বজনরা।

চায়না বেগমের জা আয়েশা বেগম বলেন, স্ট্রোক করার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু নামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেমন উন্নতি হয়নি। আমাদের রোগীর আবার বমি শুরু হওয়ায় বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের এতো বড় দালানে যদি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা চালু না হয়, তাহলে আমাদের ভোগান্তি কমবে কবে?

শুধু চায়না বেগম নয়, তার মতো জেলার ৪২ লক্ষাধিক মানুষ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড চালু করা যাচ্ছে না। রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্সও নেই।

অপরদিকে হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবার পাশাপাশি এক হাজার বেডে উন্নত ও সার্বক্ষণিক রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন জেলার মানুষ। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও জনবল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসা নেন। বহির্বিভাগে ১০৫ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও আছে ২৪ জন। এছাড়াও অন্তঃবিভাগে আইসিইউ, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও অর্থপেডিক ওয়ার্ডের কার্যক্রম শুরু হয়নি। আইসিইউ ওয়ার্ডে ২০ বেডের মধ্যে ১০ বেড প্রস্তুত করলেও জনবল সংকটে তা চালু করা যাচ্ছে না। এছাড়াও ৩৬ জন টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন থাকলেও একজনও টেকনিশিয়ান নেই হাসপাতালে।

ইনডোরে ১১৬ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও আছে ২০ জন। ১৯৩ জন নার্সের প্রয়োজন থাকলেও আছে ১৮৭ জন। আরো ২০০ নার্সের চাহিদা পাঠানো আছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ২০ জনের চাহিদা থাকলেও আছে ১৮ জন। ২১০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাহিদা থাকলেও আছে ৩৭ জন। অপর দিকে ব্রেইনের পরীক্ষার জন্য ইলেকট্রো অ্যান্ড ক্যাফালোগ্রাম মেশিন, হার্টের রিং পড়ানোর জন্য কেথল্যাব ও এনজিও গ্রাম মেশিনের সংকট রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ২০১৪ সালের শুরুতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালে ১৪ নভেম্বর তড়িঘড়ি করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের ভবনটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের তিন বছরেও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। জরুরি বিভাগেও একই চিত্র দেখা যায়। মেডিসিন ওয়ার্ডে নির্ধারিত আসনের চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। অনেকে বেড  না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভর্তিকৃত রোগীদের বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।

দেলদুয়ারের কেউরিয়ার নুরুল ইসলাম বলেন, গতকাল আমার শ্যালকের স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। রোগীর চাপ থাকায় মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আমি ইতিপূর্বেও একাধিকবার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু এখানে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় না। টাঙ্গাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকা সত্বেও আমার ঢাকায় যেতে হচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি নাল্লাপাড়া গ্রামের আবু সাইদ বলেন, হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কষ্ট হচ্ছে। আবার বাথরুমও নোংরা। হাসপাতাল পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা থাকলে ভালো লাগে।

মধুপুরের হাবিব মিয়া বলেন, আমি প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূর থেকে এসেছি। কিন্তু ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছি না। চিকিৎসকরা সময়ও কম দেন। হাসপাতালে থাকা দালালরা অনেক ক্ষেত্রে বাইরে যেতেও বলেন।

টাঙ্গাইলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের হাসপাতালে পদ আছে ৮৬০টি। এর মধ্যে সৃষ্ট পদই রয়েছে ৫৫ জন ডাক্তারসহ ৩২২টি। এত বড় হাসপাতালে রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স নেই। ভবনেরও ত্রুটি থাকায় গণপূর্তকে বার বার চিঠি লিখেও কাজ হচ্ছে না। কেথল্যাব, ডায়ালাইসিসহ দক্ষ জনবলের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।