সারা বাংলা

নীরব কষ্টের একই বৃত্তে আটকে আছে জীবন

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে কারখানার ভেতরের ব্যস্ততা। মেঝেতে পাটি পেতে সারিবদ্ধভাবে বসে কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা। চারদিকে ছড়িয়ে তামাকের গুঁড়া। শ্রমিকদের কারো হাতে কাঁচা তামাক, কেউ ব্যস্ত বিড়ি গুটিয়ে নির্দিষ্ট আকারে সাজাতে। সময় গড়ায়, কিন্তু থামে না কাজের চাকা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরিশাল বিভাগে প্রায় ৪৫ বছর আগে হাতে তৈরি বিড়ি উৎপাদনের প্রসার ঘটে। ঝালকাঠিতে এর কার্যক্রম শুরু হয় প্রায় ২৫ বছর আগে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন তেমন হয়নি। মে দিবসে শ্রমিক অধিকারের যে কথা উচ্চারিত হয়, তা এখনো ঝালকাঠির এই বিড়ি শ্রমিকদের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। তাদের নীরব কষ্ট যেন এখনো অদেখাই রয়ে গেছে।

ঝালকাঠির অমৃত লাল দে কারিকর বিড়ি কারখানা শ্রমজীবী মানুষের এক নীরব বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে যখন শ্রমিক অধিকার নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন এই শ্রমিকদের জীবন একই বৃত্তে আটকে আছে বছরের পর বছর। 

কারখানাটিতে প্রায় ২৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের অধিকাংশই নারী। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কাজ করেও তাদের দৈনিক আয় সীমাবদ্ধ থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। প্রতি হাজার বিড়ি তৈরির জন্য মজুরি নির্ধারিত ১০৪ টাকা। একজন শ্রমিক দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার বিড়ি তৈরি করলেও মাস শেষে আয় দাঁড়ায় মাত্র ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। 

শ্রমিকদের অভিযোগ, সপ্তাহে কার্যত মাত্র তিনদিনের কাজ হিসাব করা হয়। ফলে মাসিক আয় আরো কমে যায়। বছরে বোনাস হিসেবে দেওয়া হয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। উৎসবের সময় সীমিত পরিসরে কিছু খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ স্বাস্থ্যঝুঁকি। সারাদিন তামাকের গুঁড়া ও ধুলাবালির মধ্যে কাজ করার কারণে শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। 

কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে এবং নিয়মিত তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। 

কাজের মধ্যে কথা হয় ২৫ বছর বয়সী ময়না বেগমের সঙ্গে। কাজ না থামিয়ে তিনি বলেন, “এই কাজ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সংসারের খরচ চালাতে যা পাই, তা দিয়েই চলতে হয়।” 

পাশেই কাজ করছিলেন ৪০ বছর বয়সী নাজমা। এই শ্রমিক বলেন, “অনেক বছর ধরে এই কাজ করছি। অন্য কোথাও কাজের সুযোগ নেই, তাই এখানেই পড়ে আছি।” 

কারখানার এক কোণে চুপচাপ কাজ করছিলেন ৬০ বছর বয়সী মালা রাণী। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় হাত চলে দ্রুত, কিন্তু কণ্ঠে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “জীবনের বেশিরভাগ সময় এখানেই কেটে গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবুও থামার সুযোগ নেই, কারণ ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই।” 

শুধু নারীরাই নন,পুরুষ শ্রমিকরাও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। বিড়ি প্যাকেটজাত করণে ব্যস্ত ৬৯ বছর বয়সী কবির বলেন, “এখানে কাজ করে কোনো সঞ্চয় করা যায় না। অসুস্থ হলে নিজের খরচেই চিকিৎসা করতে হয়।” 

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. টি এম মেহেদী হাসান সানী বলেন, “দীর্ঘসময় তামাকের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসযন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে যক্ষ্মা, হাঁপানি ও ব্রংকাইটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।” 

কারখানার ম্যানেজার রতন কুমার দত্ত জানান, প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ লাখ বিড়ি উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিকদের সুবিধার বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে এমনটি দাবি করেন তিনি। 

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই খাতের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আককাস সিকদার বলেন, “অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কম মজুরি এবং অনিরাপদ কর্মপরিস্থিতি সব মিলিয়ে এটি শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।” 

বরিশাল বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. সেলিম রাঢ়ী জানান, সপ্তাহে সীমিত কর্মদিবস ও কম মজুরির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাপন দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি ন্যায্য মজুরি, পূর্ণ কর্মদিবস, চিকিৎসা সুবিধা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠনের দাবি জানান।