সুনামগঞ্জে আবারো বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান কাটা ও শুকানো নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। টানা দুর্যোগের পর দুইদিন বিরতি দিয়ে শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। শনিবার (২ মে) বেলা ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, আর যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও ঠিকমতো শুকাতে না পারায় পঁচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দিনরাত পরিশ্রম করে উৎপাদিত ফসল হারানোর আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। অনেকেই বলছেন, প্রকৃতির সঙ্গে এই লড়াইয়ে টিকে থাকা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হাওরজুড়ে এখন উদ্বেগ আর হতাশার চিত্র।
মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটার কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ভোরে কৃষকরা মাঠে গেলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ শুরু করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের হাওর থেকে ফিরে যেতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাতের আতঙ্ক।
সুনামগঞ্জের কাঙলা হাওরের কৃষক মনাফ মিয়া বলেন, “দুইটা দিন মেঘ বৃষ্টি হয়নি। ভাবছিলাম, যা পাইছি অন্তত সেই ধান শুকাতে পারব। মধ্যরাতে আবার বৃষ্টি শুরু। এখন কিভাবে ধান শুকাব, আর কিভাবেই আমরা বাঁচব।”
একই হাওরের জাকারিয়া হোসেন বলেন, “সকাল থেকে হাওরে গিয়ে বসে ছিলাম ধান কাটার জন্য। বৃষ্টি শুরু হয়েছে তার মধ্যে বুক সমান পানি। ধান কাটা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাধ্য হয়ে ধান রেখে চলে আসতে হয়েছে।”
শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানির স্তর ৪.৪৮ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপৎসীমার ১.৫৭ মিটার নিচে অবস্থান করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে জেলায় ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।”
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। শনিবার (২ মে) পর্যন্ত ৫৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। তাদের হিসাবে, প্রাথমিকভাবে জরিপ করে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে। আরো কয়েকটি দিন গেলে পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে।
কৃষকরা জানান, এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে ধান আর রক্ষা করা যাবে না। তারা দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
দেখার হাওরের কৃষক সামসুউদ্দিন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “হাওরে শ্রমিক নেই, অনেক কষ্টে কয়েকজন শ্রমিক খুঁজে আজকে ভোরে নিয়ে এসেছিলাম। বৃষ্টির জন্যে কেউ হাওরে নামতে পারেনি। কারণ হাওরে প্রায় গলা সমান পানি। এখন শ্রমিকরা চলে যাচ্ছে। তাদের বিদায় দিতে যাচ্ছি কিছু টাকা দিয়ে দিতে হবে। আমার ধানও গেল আজকে শ্রমিকের মজুরিও গেল। এখন সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায় তাহলে কিছুটা রেহাই পাব।”
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত জরিপ করে পেয়েছি, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কৃষক যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের তালিকা উপজেলা ভিত্তিক হচ্ছে। আমরা নিয়মিত হাওরের খোঁজ রাখছি। কয়েকদিন গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।”