কালবৈশাখী ঝড় ও কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে নিচু জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। তারা জানান, সবজি গাছের গোড়ায় দীর্ঘ সময় পানি থাকছে। এতে শিকড় পচে গিয়ে গাছ ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। যে কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে মাটির ভেতরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, যা গাছের শিকড়ের জন্য ক্ষতিকর। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং রোগ-বালাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছত্রাকজনিত রোগ বাড়ার ঝুঁকি থাকে, যা ফসলের পচনকে ত্বরান্বিত করে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি ঘুরে দেখা যায়, ভুট্টার গাছগুলো প্রায় হেলে পড়েছে। পাকা ধানের ক্ষেতে পানি উঠায় চাষিরা ধান কাটতে ভোগান্তিতে পড়ছেন। যারা কুমড়া চাষ করেছেন, তারা এই সবজি ছোটো অবস্থায় ক্ষেত থেকে তুলে ফেলছেন। অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে ছোট নালা কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। তবে, বৃষ্টির কারণে পানি নামার গতি খুবই ধীর, ফলে তাদের এই প্রচেষ্টাও অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বৃষ্টির পানি জমিতে থাকায় বেগুন, মরিচ, টমেটো, লাউ ও শসার মতো সবজি গাছ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে, আবার কোথাও পুরো গাছই মারা যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কৃষক রমজান আলী বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে সবজি চাষ করি। টানা বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। জমিতে পানি জমে থাকায় গাছ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি না নামলে আর কিছুই করার নেই।”
শুধু সবজি নয়, অন্যান্য ফসলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ধান ও ভুট্টা ক্ষেতেও পানি জমে থাকায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভুট্টা চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভুট্টা গাছের গোড়ায় পানি থাকায় গাছ দুর্বল হয়ে হেলে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছ ভেঙেও যাচ্ছে, ফলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তাদের।
আকচা এলাকার ভুট্টা চাষি জাহিদ মিলু বলেন, “ভুট্টা গাছ একটু বড় হলেই পানি সহ্য করতে পারে না। এখন জমিতে হাঁটু পানি, এতে গাছ হেলে পড়ছে, অনেক জায়গায় ভেঙেও যাচ্ছে। আমাদের অনেক ক্ষতি হবে।”
সদর উপজেলার রহিমান পুরের কৃষক সোহেল রানা বলেন, “আমরা ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করি। যদি ফসলই না থাকে, তাহলে কিভাবে ঋণ শোধ করব? এখন একমাত্র ভরসা আবহাওয়া ভালো হওয়া আর সরকারের সহায়তা।”
কৃষি অধিদপ্তরের ধারণা, শুধু ঝড়ের কারণে ভুট্টা ৩৫৮ হেক্টর, মরিচ ৯৪ হেক্টর, শাক-সবজি ২১ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ এক হেক্টর, আম-লিচু ও পেঁপে মিলিয়ে ৩৮২ হেক্টর এবং কলা ৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আলমগীর কবির বলেন, “টানা ভারী বর্ষণের কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে সবজি ও ভুট্টা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে এবং প্রয়োজনে রোগবালাই দমনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে।”
তিনি আরো বলেন, “যেসব জমিতে পানি বেশিদিন থাকে, সেখানে পরবর্তী চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করতে বাড়তি যত্ন নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়।”