সারা বাংলা

মানিকগঞ্জে তিন মাসে ১০ খুন, ৫৭ অপমৃত্যু

মানিকগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সহিংস ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, গত তিন মাসে জেলায় ১০টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫৭টি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই ৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ বিরোধ এবং মাদকের প্রভাবকে কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে। একটির রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন ঘটনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে।

সম্প্রতি একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হন। এছাড়া ভাইয়ের হাতে ভাই এবং বন্ধুর হাতে বন্ধুর খুনের মতো ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে, সালিশের সময় নির্যাতনের অভিযোগে এক তরুণীর আত্মহত্যার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

গত ১৬ এপ্রিল সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়া এলাকায় আতিকা আক্তার (৭) নামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মরদেহ ভুট্টাক্ষেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, স্বর্ণালঙ্কার লুটের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর উত্তেজিত জনতার হামলায় অভিযুক্ত নাঈমের বাবা পান্নু মিয়া (৪৫) এবং চাচা ফজলু মিয়া নিহত হন।

এর আগে, ১৮ এপ্রিল শিবালয় উপজেলায় গ্রাম্য সালিশ চলাকালে প্রকাশ্যে মারধর, কিল-ঘুষি ও লাঠির আঘাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন নাজমা আক্তার (২৫)। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। তিনি একটি তালা তৈরির কারখানায় কর্মরত ছিলেন। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ১১ জনের নাম উল্লেখসহ আরো ৫-৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন।

২৪ এপ্রিল সিংগাইর উপজেলার গোলড়া মহল্লায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের হামলায় বড় ভাই নজরুল খন্দকার (৬০) নিহত হন। পরে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশি বৈঠক চলাকালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে খন্দকার রাফি তার চাচা ওহিদ খন্দকারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব খান বলেন, ‍“জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। মাদক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।” তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

ইয়াসিনুর রহমান বলেন, “পারিবারিক অস্থিরতা, বেকারত্ব এবং মাদকের বিস্তার সমাজকে আরো জটিল করে তুলছে। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় ছোট বিরোধও প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সামাজিক ঐক্য ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।”

মানিকগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী বজলুর রশীদ বলেন, “অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সৎ ও যোগ্য মানুষদের কাজের সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়। প্রশাসন দায়িত্বশীল হলে একটি শান্ত ও স্থিতিশীল মানিকগঞ্জ গড়ে তোলা সম্ভব।”

মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, “শিক্ষার হার বাড়ানো প্রয়োজন হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর মানসিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। শিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে সামাজিক অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, “সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিক সহিংসতার চেয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তাই পরিবার ও সমাজভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানোই সমাধানের মূল পথ।”

মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, “বেশিরভাগ ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে, এসব রোধে পুলিশ ছাড়াও সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।”