শেরপুর জেলায় ডিজেল সংকটে শতাধিক ধানকাটার মেশিন ও পাঁচ শতাধিক ধান মাড়াই মেশিন বন্ধ রয়েছে। অর্ধেক মেশিন ধান কাটার জন্য মাঠে নামলেও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা চলছে। মাড়াই কলগুলোও বেশি সময় চালানো যাচ্ছে না। মেশিনের অভাবে কৃষকের বাধ্য হয়ে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হচ্ছে। প্রায় দেড় মণ ধানের দামে একজন শ্রমিক মিলছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, দ্রুত ডিজেল সংকট দূর না করলে কৃষকের বোরো ধান ক্ষতির মুখে পড়তে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার জেলার পাঁচ উপজেলায় ৯১ হাজার ৮১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ হয়েছে ৯১ হাজার ৯৪৯ হেক্টরে। যা লক্ষমাত্রার চেয়ে ১৩৮ হেক্টর বেশি। মাঠের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে। ধান কাটা হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। শ্রমিক ও ধানকাটার মেশিনের অভাবে কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারছে না।
শেরপুর জেলায় ১২৫টির বেশি ধানকাটার মেশিন ডিজেল সংকটে পড়ে আছে। পাঁচ শতাধিক মাড়াই মেশিনও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিও হচ্ছে। একটি ধানকাটার মেশিনে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০ লিটার তেলের চাহিদা বিপরীতে ১০ থেকে ১৫ লিটার পেয়ে কাজ করা যাচ্ছে না।
নালিতাবাড়ি ও ঝিনাইগাতী উপজেলা বন্যাপ্রবণ এলাকা হওয়ার কারণে ক্ষতির শঙ্কা তাদের সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধানের জমিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কয়েকদিন বৃষ্টি হলে সেই ধান আর ঘরে তোলার উপায় থাকবে না। প্রায় প্রতি বছর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়।
এদিকে হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কায় অনেক শ্রমিক সেদিকে চলে যাওয়ার শ্রমিক সংকটের তাদের পারিশ্রমিকও বেড়ে গেছে। একজন শ্রমিককে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। যা প্রায় দেড় মণ ধানের দামের সমান।
লসমনপুর এলাকার ধানকাটার মেশিন মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, তার চারটি ধানকাটা মেশিনের মধ্যে দুটি বন্ধ রয়েছে। একটি মেশিন দিয়ে হাওর এলাকায় ধান কাটছেন। অন্য একটি মেশিন দিয়ে মাঝে-মধ্যে ঝিনাইগাতী উপজেলায় ধান কাটছেন।
কৃষি বিভাগের প্রত্যয়ণ থাকার পরে পাম্প মালিকরা জ্বালানি তেল দেন না বলে জানান তিনি।
কুসুমহাটি এলাকার মেশিন মালিক রঞ্জু মিয়া বলেন, ভোরবেলা পাম্পে গিয়ে তেলের সিরিয়াল দিয়ে তেল পান ১০-১৫ লিটার। তার প্রতিদিন তেলের চাহিদা প্রায় দুইশত লিটার। ভরা মৌসুমে কৃষকের ধান কাটতে পারছেন না।
শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নিলু বলেন, বোরো মৌসুমে পুরোদমে ধান কাটা চলছে। এতে ধানকাটা ও মাড়াই করার জন্য হারভেস্টার মেশিন ও মাড়াই মেশিনের প্রয়োজন। যার জন্য এখন ডিজেলের চাহিদা বেশি। সময় মতো কৃষকের ডিজেল সরবরাহ না করা গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ এখন শ্রমিকের সংকট।
তিনি আরো বলেন, আবার আউশের আবাদ চলমান থাকায় ট্রাক্টরের জন্যও ডিজেল দরকার। মানুষ এখন গরু দিয়ে হালচাষ কমিয়ে দিয়েছে। জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে, যাদের কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, তাদের যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ করা হয়।
এ ব্যাপারে শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডিজেল সরবরাহ করার জন্য লিখিতভাবে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। উপজেরা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ডিজেল চালিত কৃষি যন্ত্রপাতির তালিকা করে তাদের প্রত্যয়নপত্র পাম্প মালিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। যাতে করে তাদের চিহ্নিত করা যায় এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল পান।
এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি পাম্প মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বলতে রাজি হননি। নতুন বাস টার্মিনালে অবস্থিত মমিনবাগ সার্ভিস স্টেশনের মালিক তৌহিদুর রহমান পাপ্পু বলেন, ‘‘আমাদের প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল দেওয়া হয়, আমরা তা সিরিয়ালের মাধ্যমে দিয়ে থাকি। ট্যাগ অফিসার উপস্থিত থাকে। সরবরাহ বাড়লে সবার চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া সম্ভব হবে।’’