বরগুনায় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরো ৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত তিন মাসে চার হাজারের বেশি মানুষ ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ভর্তি রোগীরা বলছেন, হাসপাতালে বেড, ওষুধ ও চিকিৎস্যক সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।
চিকিৎস্যকরা বলছেন, বেডের থেকে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় চিকিৎস্যা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
চলতি বছর বরগুনায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯৩ শিশু, তাদের মধ্যে মারা গেছে ৬ জন। হামের ভয়াবহতা না কাটতেই জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়া।
গত তিন মাসে জেনারেল হাসপাতাল ও ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ১৯৬ জন। যার মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি।
রোগীদের চাপ সামলাতে না পেরে শিশু-নারী ও পুরুষদের রাখা হয়েছে একই কক্ষে। বেড ও মেঝেতে বিছানা করে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন আক্রান্ত রোগীরা।
ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে সদরের বিবেকচত্বর এলাকার ৮ বছরের শিশু মুসা ভর্তি হয়েছে বরগুনার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসাপাতালে।
মুসার মা ময়না বেগম বলেন, রা“ত থেকে হঠাৎ পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হয় মুসার। এরপর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লে শনিবার সকালে হাসপাতালে নিয়ে আসলে ভর্তি দেয় চিকিৎস্যক। কিন্তু হাসপাতালে বেড না থাকায় মেঝেতেই চিকিৎস্যা নিতে হচ্ছে। মেঝেতে চিকিৎস্যা নেওয়ায় ডায়রিয়ার পাশাপাশি এখন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে মুসা।”
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন ১২১ জন রোগী। ওয়ার্ডে দেখা যায় মুসার মতোই শিশুর সংখ্যা বেশি। এরপর নারী রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে, সব থেকে বেশি শিশু ও বৃদ্ধ।
কেওড়াবুনিয়া এলাকার সবুজ মিয়া তার ছেলে সিয়ামকে ভর্তি করেছেন সোমবার রাতে। সবুজ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “হাসপাতালের মেঝেতে জায়গা পেয়েছি। পা ফেলার মতো জায়গা নেই। ডায়রিয়ায় শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ না করে নারী-পুরুষসহ সব বয়সি মানুষ একই কক্ষে চিকিৎস্যা নিচ্ছে।”
পৌরশহরের নাথপট্টি এলাকার ধীরেন্দ্র নাথ সরদার তার ৪ বছরের মেয়ে বৃষ্টি রানীকে ভর্তি করেছেন হাসাপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে বৃষ্টি কিছুটা সুস্থ্য হলেও হাসপাতালে থাকতে থাকতে আক্রান্ত হয়েছে তার বড় মেয়ে মেঘলা রানী ও স্ত্রী আশা রানী। এখন তারাও ভর্তি হাসাপাতালে। হাসপাতাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না রাখা এবং সব বয়সী রোগীদের এক কক্ষে চিকিৎস্যা দেয়ায় রোগীদের সাথের স্বজনরাও আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়ায়।
ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন ৭৪ বছরের বৃদ্ধ আলম আলী চৌকিদার। তিনি বলেন, “হাসাপাতালে শুধু স্যালাইন দিচ্ছে বাকি সব ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাহিরে থেকে। অথচ এই ওষুধ কেনার সামর্থ্য অনেকেরই নাই।”
রোগীদের অভিযোগ, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসক আসেন একবার দুপুর ১২টায়। এরপর কেউ ভর্তি হলে তারা ফের চিকিৎসকের দেখা পায় পরের দিন দুপুর ১২টায়।
২৫০ শয্যা বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) তাজকিয়া সিদ্দিকাহ রাইজিংবিডিকে বলেন, “বাসি, পচা খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত গরম, অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুপেয় পানির অভাবের কারণে এবং স্যালাইন ওয়াটার হয়ে যাওয়ার কারণে ডায়রিয়া এবং ডায়রিয়ার ডিজিস টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েডসহ অন্যান্য রোগের প্রকোপ বাড়ে।”
হাসপাতালের তত্বাবধায়ক রেজওয়ানুর আলম রাইজিংবিডিকে বলেন, “২৫০ শয্যা হাসপাতালে হাম, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৫০০ বেশি। তাই ছোটোখাটো কিছু অভিযোগ থাকলেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া আমাদের লক্ষ্য।”
ওষুধ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্যালাইনের সংকট নেই। ডায়রিয়ায় সব থেকে বেশি প্রয়োজন স্যালাইন, আমাদের সেসব আছে। এছাড়া, কিছু ওষুধ আমাদের নেই, সেসব বাইরে থেকে কিনতে হয়।”
বরগুনার সিভিল সার্জন আবুল ফাত্তাহ রাইজিংবিডিকে বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৪ জন। আবহাওয়া বিবেচনায় প্রতি বছর এই সময়ে এমন পরিস্থিতি হয় উপকূলে।”
তরমুজসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল খাওয়ায় সতর্ক থাকার পাশাপাশি খাবার ও রান্নার পানি বিশুদ্ধকরণের পরামর্শ দেন তিনি। হাসপাতালের সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “চিকিৎস্যক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে জেলার সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।”