“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন ঘিরে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখে আসছি কুঠিবাড়ির মেলা। মেলার কয়েকদিন আগে থেকে মেয়ে-জামাই, আত্মীয়-স্বজন শিলাইদহে ভিড় করতেন। এখন মেলার সেই জৌলুস দেখি না। এবার নাকি মেলাই হচ্ছে না। দোকানদার সব চলে যাচ্ছে।”
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকালে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের কসবা গ্রামের রবিউল ইসলাম (৬৪)। কুঠিবাড়ির পেছনে তার মুদিখানার ব্যবসা আছে।
মাদারীপুর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে কুঠিবাড়ি মেলায় আসছেন মো. আনোয়ার হোসেন (৪৭)। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। টাকা খচ্চা করে আমরা আসছি। মেলার নাকি অনুমতি নেই। এখন সবাই চলে যাচ্ছি। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। সামনের বছর থেকে আর এই মেলায় আসব না।”
২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জয়ন্তী। এই উৎসব ঘিরে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত বছরও এ উপলক্ষে কুঠিবাড়ির সামনের আমবাগানে বসেছিল গ্রামীণ মেলা। ২৫ বৈশাখের আগেই এ বছরও দূর- দূরান্ত থেকে এসেছেন কসমেটিক্স, খেলনাসহ হরেকরকম পণ্যের ব্যবসায়ীরা। তবে, অদৃশ্য কারণে এবার মেলা হচ্ছে না। এ কারণে দোকানপাট গুছিয়ে দুঃখ ভরা মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন তারা।
শরীয়তপুর থেকে আগত খেলনা ব্যবসায়ী মীর বাবুল (৫৫) বলেন, “১৫ বছর ধরে কুঠিবাড়ির মেলায় ব্যবসা করছি। এবারও দুইদিন আগে এসে কুঠিবাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে দোকান দিছিলাম। বুধবার বিকেলে প্রশাসনের লোকজন এক ঘণ্টার মধ্যে দোকান ভেঙে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার বৃষ্টি ছিল। তাই এখন দুঃখভরা মন নিয়ে চলে যাচ্ছি।”
তার ভাষ্য, “প্রায় শতাধিক ব্যবসায়ী দোকান বসিয়েছিল। চলে যেতে বাধ্য হওয়ায় তাদের প্রত্যেকের পাঁচ-দশ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।”
“প্রতি বছরই কুঠিবাড়ির মেলা করি। কিন্তু এবার আইসা এভাবে ভাঙা মন নিয়ে চলে যাবো কল্পনাও করিনি।” বৃহস্পতিবার আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুরের দরিয়া থানা থেকে আগত আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী। তিনি বলেন, “সবাই দুঃখভরা মন নিয়ে চলে যাচ্ছি। অনেক টাকা লস হয়ে গেল। সামনের বছর থেকে আর আসব না। কুঠিবাড়ি মেলার ঐতিহ্য এবারই হারিয়ে গেল।”
শিলাইদহ গ্রামের ৭২ বছর বয়সি আব্দুস সাত্তার বলেন, “দেশ স্বাধীনের পর থেকে দেখছি কুঠিবাড়ির মেলা। কোনো বছরই ঐতিহ্যবাহী মেলা মিস যায়নি। তবে এবার যে কি কারণে মেলা হচ্ছে না জানা নেই। তবে, যে কোনোভাবেই হোক ঐতিহ্যবাহী কুঠিবাড়ির গ্রামীণ মেলা টিকিয়ে রাখতে হবে।”
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন বলেন, “কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও কালচারাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এবার মেলা হচ্ছে না।”