সারা বাংলা

সাভার-আশুলিয়ায় বাড়ছে নারী নির্যাতন, তিন মাসে ধর্ষণের ২৪ মামলা

সাভার ও আশুলিয়ায় সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দুই থানায় অন্তত ২৪টি মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এসব ঘটনায় ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনও পলাতক রয়েছে কয়েকজন আসামি। একের পর এক ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় আতঙ্ক ও অনিরাপত্তা বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।

বাসে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ:

গত ১৫ জানুয়ারি সাভারের রেডিও কলোনি এলাকা থেকে আশুলিয়াগামী একটি বাসে ওঠেন এক তরুণী। অভিযোগ অনুযায়ী, পথে অন্য যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর বাসচালক আলতাফ ও তার সহযোগী সাগর তরুণীকে ধর্ষণ করেন। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরে বাসটি নিয়ে সাভার, আশুলিয়া ও চন্দ্রা এলাকায় ঘোরাঘুরির পর পরদিন দুপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের করটিয়া আন্ডারপাস এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের একটি টহল দল বাসটি থামায়। তখন ওই তরুণী পুলিশের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ করেন।

এরপর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং চালকসহ তিনজনকে আটক করে।

থানাভিত্তিক মামলার চিত্র:

পুলিশের সাভার সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সাভার মডেল থানায় ছয়টি এবং আশুলিয়া থানায় ১৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে।

সাভার থানার মামলাগুলোতে ১১ জন আসামির মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আশুলিয়ার ১৮ মামলায় ২২ জন নাম উল্লেখ করে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, আরো ছয় থেকে সাতজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ:

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও এসেছে।

গত ১৬ এপ্রিল সাভারের ডগরমোড়া এলাকায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া, গত ১৪ মার্চ আশুলিয়ায় ধর্ষণ মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. ইমরান, যিনি ‘বিপি ইমরান’ নামে পরিচিত, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই মামলায় আরো দুজন পলাতক রয়েছেন।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, টিকটক ভিডিও তৈরি বন্ধ করতে চাইলে তাকে ধর্ষণ ও মারধর করা হয়।

গত সাতই এপ্রিল সাভারের বিরুলিয়ায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে আব্দুল বারেক নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ও নববধূ নির্যাতনের অভিযোগ:

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এস এম তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার সনদ স্থগিত করে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এর আগে ২৪ জানুয়ারি আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় স্বামীকে জিম্মি করে এক নববধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে এ ঘটনায় র‍্যাব একজনকে গ্রেপ্তার করে।

‘অনেক ঘটনাই সামনে আসে না’:

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার থানায় যেতে চায় না। ফলে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।

সাভার দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, “নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। লোকলজ্জার কারণে অনেকেই থানায় যেতে চান না। এই প্রবণতা কমাতে সমাজের সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।”

ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান বাদল বলেন, “ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী সামনে আসতে চান না। এতে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়।”

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, ট্রাফিক অ্যান্ড অপস) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “গত তিন মাসে সাভার ও আশুলিয়ায় ধর্ষণসংক্রান্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”