সারা বাংলা

বাগেরহাটে চারা গজিয়েছে পাকা ধানে, লোকসানে কৃষক 

মাঠে নুয়ে পড়া পাকা ধানে গজিয়েছে চারা। পানির মধ্যে থাকা সেই ধান যত্নের সঙ্গে কাটছেন শ্রমিক। চড়া দামে নেওয়া শ্রমিকদের কাটা এই ধান কৃষকের তেমন কোনো কাজে আসবে না। চাষিদের ভাষ্য, এই ধান যেমন বিক্রি করা যাবে না, তেমনি তা থেকে পাওয়া চাল খাওয়ার অনুপযোগী। 

মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কয়েক দিনের বর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে।

নরেন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক শেখ রুস্তম আলী এবার ২ একর ৫০ শতক জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে তার ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি ধান নুয়ে পড়েছে। এই ধানে চারা গজিয়েছে। শুধু রুস্তম নয়, পুরো জেলা জুড়ে অনেক ধান চাষির ক্ষেতের একই অবস্থা। গেল তিনদিন ধরে বৃষ্টি না থাকলেও, জমে থাকা পানিতে চারা গজিয়েছে নুয়ে পড়া পাকা ধানে। 

কৃষক শেখ রুস্তম আলী বলেন, “আড়াই একর জমি করতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে এই ধান কেটে মাড়াই করতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগত। এখন এই ধান ঘরে তুলতে অন্তত ৮০ হাজার টাকা লাগবে। এবার যে কি হবে জানি না, গরুর জন্য কুটা না লাগলে ধানই কাটতাম না।” নিজের জমি না হলে, এবার পথে বসা লাগত বলে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন মাঝ বয়সী এই কৃষক। 

একই গ্রামের কৃষক মোজাফফের মোল্লা জানান, “আমার জমি নেই। ২০ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে এক বিঘা জমি আবাদ করেছিলাম। বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া সব ধানেই চারা হইছে। এলাকার সবার ধানেরই একই অবস্থা, দিনে এক হাজার টাকা দিয়েও কোনো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে মাদ্রাসায় পড়া ছেলেকে নিয়ে ধান কাটতে নেমেছি।”

দেড় বিঘার মাছের ঘেরে বোরো ধান লাগিয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার উৎকুল গ্রামের চাষি হুমায়ুন কবির। শ্রমিকের অভাবে পানির নিচে থাকা ধান তো উঠাতেই পারেননি, অন্যদিকে ধান ও নাড়া পঁচা পানিতে ঘেরের মাছ মরে যাচ্ছে বলে জানান এই কৃষক। 

হুমায়ুন কবির বলেন, “ধান তো গেছেই, কুটাও ঘরে যাবে না। ঘেরে থাকা চিংড়ি ও সাদা মাছ মরা শুরু করেছে। জাল টেনে কিছু মাছ তুলে বিক্রি করেছি। এবারের বৃষ্টিতে আসলে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে।” 

ধান চাষি আমির হাওলাদার বলেন, “এবার ধান অনেক ভালো হয়েছিল। বৃষ্টি ও বাতাসে ধান ঝড়ে যাওয়ার পরেও দুই বিঘা জমিতে ৮০ মণ ধান পেয়েছি। তবে, ধান ভিজা থাকায় দাম একদম নেই বললেই চলে। ৭৫০ টাকা মণে বিক্রি করেছি ধান। খরচের টাকা উঠে আসা দায় হবে। এবার লোকসান হবে।” 

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, “বৃষ্টির পরে আমরা মাঠ পরিদর্শন করেছি। অনেক কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না, মজুরিও অনেক বেশি। খোলা বাজারে ভেজা ধানের দামও কম। আর বৃষ্টিপাত না হলে, চাষিরা কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।” 

তিনি আরো বলেন, “বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি প্রণোদনা বা সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”