কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের এক অভিনব ও নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। একই নির্মাণ কাজ ভিন্ন অর্থবছরে এবং ভিন্ন প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে পৌরসভা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তোয়াক্কা না করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে খোদ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করে এই হরিলুট চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচরা বেপারি বাড়িসংলগ্ন পুকুর পাড়ে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এডিবির অর্থায়নে একটি প্যালাসাইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এক বছর আগেই ঠিকাদার এই কাজ শেষ করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, সেই একই দেওয়ালে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ‘গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি’র আওতায় ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে পুনরায় ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক বা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের থাকার কথা থাকলেও চৌদ্দগ্রাম পৌরসভায় ঘটেছে তার উল্টো। কমিটির সবাই পৌরসভার বেতনভুক্ত কর্মচারী। কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী
মনিরুজ্জামান পাটোয়ারী, সাধারণ সম্পাদক সহকারী লাইসেন্স পরিদর্শক মো. লোকমান হোসেন, সদস্যবৃন্দ: পাম্প চালক লোকমান হোসেন, বাজার আদায়কারী শহিদুল ইসলাম ও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ইমাম হোসেন সজিব।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, ‘‘গত বছর কাজ করেছে। শ্রীপুর কাজী বাড়ি এলাকার একজন এখানে কাজ করে গেছে নাম মনে নাই। এছাড়া এখানে আর কোন কাজ হয়নি।’’
এসময় স্থানীয় আরও কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একবছর আগের কাজ নতুন করে দেখানো হয়েছে শুনে হতবাক হয়ে গেলাম! পৌরসভার দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেট না জানি আরও কত অনিয়ম করছে। তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে চৌদ্দগ্রাম মডেল মসজিদ সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে মডেল মসজিদ সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প কমিটির সভাপতি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিল্ড সুপারভাইজার রুহুল আমিন বরাদ্দকৃত টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও কাজের বিবরণ জানেন না বলে জানান। কমিটির সাধারণ সম্পাদক উপজেলা প্রকৌশল অফিসের সহকারী প্রকৌশলী তৌহিদ বিন আজম এবং সদস্য মডেল মসজিদের খতিব মুফতি আবদুর রহিম জানান, তারা কমিটিতে আছেন শুনলেও বরাদ্দ বা কাজের বিষয়ে কিছুই জানেন না।
অনুরূপ অভিযোগ উঠেছে চৌদ্দগ্রাম এইচজে পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে। ওই প্রকল্পে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পাঁচরা বেপারি বাড়ি প্রকল্পের সভাপতি মনিরুজ্জামান পাটোয়ারী মিটিংয়ে ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, কাজ দেখেই বিল দেওয়া হয়েছে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি পরিপত্র দেখে পরে কথা বলবেন বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, ‘‘ওই সময়ে আমি চৌদ্দগ্রামে কর্মরত ছিলাম না। তালিকা পেলে আমি অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’’