গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ‘বাঁশকল’ আবারো ফিরে এসেছে নতুন এক বাস্তবতায়। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন গ্রামে গরু চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির আতঙ্ক বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে বাঁশের তৈরি এই পুরোনো সংকেত ব্যবস্থা।
রাত গভীর হলেই শুরু হয় পাহারা। কোনো সন্দেহজনক নড়াচড়া চোখে পড়লেই বাজানো হচ্ছে বাঁশকল। মুহূর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন গ্রামবাসী। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য এখন যেন হয়ে উঠেছে নিরাপত্তার প্রতীক।
সূত্র জানায়, গত ৫ মে গভীর রাতে কামারখন্দ উপজেলার বড়কুড়া মালোপাড়া, ছোট কুড়া ও নান্দিনা কামালিয়া গ্রাম থেকে ৯টি গরু চুরি হয়। এরপর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দা, খামারি, গ্রাম পুলিশ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পালাক্রমে চলছে রাতভর পাহারা।
গ্রামবাসীর ভাষ্য, কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় গরুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে কয়েকগুণ। তাই নিজেদের উদ্যোগেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। বাঁশকলের শব্দ মানেই পুরো গ্রামের জন্য সতর্ক সংকেত।
খামারিরা বলছেন, আগে রাত নামলেই গরু চুরির আতঙ্কে নির্ঘুম থাকতে হতো। এলাকাবাসীর সম্মিলিত পাহারা ও পুলিশের তৎপরতায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। চোরচক্রও এখন এলাকায় ঢুকতে ভয় পাচ্ছে।
গ্রাম পুলিশ সদস্যরা জানান, প্রতিটি এলাকায় রাতে টহল জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে বাঁশকল বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাকিবুল হাসান বলেন, “জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া অপরাধ দমন সম্ভব নয়। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করেছে।”
গরু চুরির শিকার কামারখন্দের বড় কুড়া গ্রামের খামারি রুহুল আমিন জানান, তার খামারে দুটি গাভী, একটি বকনা গরু ও একটি কোরবানির ষাঁড় ছিল। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ভোরে উঠে দেখেন একটি গরুও নেই। তার দাবি, চুরি হওয়া চারটি গরুর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
আরেক ভুক্তভোগী কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, গোয়ালে থাকা একটি গাভী, একটি বাছুর ও একটি বকনা গরু চুরি হয়ে গেছে। এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লিটন শেখ বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারো অনেক কৃষক বাড়তি লাভের আশায় দেশি গরু লালন-পালন করেছেন। দিনরাত পরিশ্রম করে বড় করা গরু চুরি হয়ে যাওয়ায় সবাই আতঙ্কে আছেন। তাই পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে আমরাও নিয়মিত পাহারায় অংশ নিচ্ছি।”
চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও গরু চুরি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যমুনার চর এলাকার খামারিরা বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
স্থানীয় কৃষক সুমন শেখ বলেন, “কষ্টে বড় করা গরুগুলো নিরাপদ রাখতে নিয়মিত রাতের পাহারায় অংশ নিচ্ছি।”
সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. নাজরান রউফ জানান, মানুষের জানমাল রক্ষায় জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতার কারণেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হয়েছে।
কোনো অপরাধ বা সন্দেহজনক ঘটনা দেখলেই দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানাতে তিনি বলেন, “হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশকল এখন শুধু একটি সংকেত নয়, জেলার মানুষের ঐক্য, সচেতনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।”