সারা বাংলা

নাটোরে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা ২ লাখের বেশি

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর বিশাল যোগান নিয়ে প্রস্তুত নাটোর। জেলার খামারিরা এবার ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৭টি পশু প্রস্তুত করেছেন। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত থাকছে ২ লাখ ৮২৬টি পশু, যা রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে নাটোরে ২০ হাজার ৩৭৪ জন খামারি কোরবানির পশু প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে গরু রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৫টি, মহিষ ২ হাজার ৫২০টি, ছাগল ৩ লাখ ২০ হাজার ৩৭১টি, ভেড়া ৩৪ হাজার ৩৮টি এবং অন্যান্য তিনটি পশু। জেলায় মোট পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬১১টি। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকছে দুই লাখেরও বেশি পশু।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণ নিশ্চিত করতে এবার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও স্টেরয়েড ব্যবহার বন্ধে ৪২৫ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১৪টি উঠান বৈঠক ও প্রায় ৫ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। নিয়মিত খামার পরিদর্শনের পাশাপাশি পশু পরিবহন, অর্থ লেনদেন ও খামারের নিরাপত্তা বিষয়ে খামারিদের সচেতন করা হচ্ছে।

জেলার খামারগুলোতে ঈদের আমেজ বিরাজ করছে। নাটোর সদর উপজেলার ডালসড়ক এলাকার খামারি রেকাত আলী তাঁর ড্রিমল্যান্ড ডেইরি ফার্মে এবার দেড় শতাধিক কোরবানির পশু প্রস্তুত করেছেন। পশুর খাবারের জন্য নিজস্ব ২০ বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেছেন তিনি।

রেকাত আলী বলেন, “আমার খামারের গরুর ক্রেতা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার। আগ্রহী ক্রেতারা খামারে এসে গরু দেখে কিনছেন। ইতোমধ্যে ৪৫টি গরু বিক্রি করেছি। এর মধ্যে একটি গরু ২২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে।”

তিনি জানান, এবারের ঈদ উপলক্ষে সুন্দরবন জাতের ৪৫টি ছোট আকারের গরু সংগ্রহ করেছেন, যা স্বল্প দামে কোরবানি দিতে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

শহরতলীর তেবাড়িয়া এলাকার আয়শা এগ্রো ফার্মে প্রস্তুত করা হয়েছে ৮০টি গরু। ফার্মের স্বত্বাধিকারী আকবর আলী জানান, নাটোরের পাশাপাশি ঢাকা ও নোয়াখালীর হাটে গরু নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

নাটোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, “খামারিরা যাতে নিরাপদে পশু বাজারজাত করতে পারেন, সে জন্য আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। জেলার ১২টি স্থায়ী ও ১৪টি অস্থায়ী হাটে ভেটেরিনারি টিম কাজ করছে। ক্রেতারা যাতে সুস্থ ও নিরাপদ পশু কিনতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

এদিকে, প্রতি বছরের মতো এবারো নাটোরের খামারিরা ঢাকার কচুক্ষেত, গাবতলী, মীরপুর, শাহজাহানপুর, বারিধারা, হাজারীবাগ, বাড্ডা, মৌচাক, ক্যান্টনমেন্ট, তেজগাঁও ও রামপুরাসহ বিভিন্ন পশুর হাটে যাচ্ছেন। এছাড়া, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী ও সিলেটেও নাটোরের পশুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

জেলার অন্যতম বড় পশুর হাট তেবাড়িয়ায় এখন গরু-ছাগলের ব্যাপক সমাগম দেখা গেলেও কেনাবেচার চেয়ে দরদামই বেশি চলছে। বিক্রেতা হারেছ আলী বলেন, “গরুর দাম বলেছি দেড় লাখ টাকা, কিন্তু ক্রেতারা এক লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি দিতে চাইছেন না।”

ক্রেতা মো. আতিকুর রহমান বলেন, “মনে হচ্ছে এবার গরু-ছাগলের দাম কিছুটা কম হবে। তাই সময় নিয়ে দেখে শুনে কিনতে চাই।”

তেবাড়িয়া হাট পরিদর্শনকালে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, “সিংড়াসহ জেলার ১২টি স্থায়ী হাটে প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারি টিম কাজ করছে। চলতি সপ্তাহ থেকেই জেলার ভেতরে ও বাইরে পশু বিপণন শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পশু পাঠাতে আগ্রহী খামারীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পুরো কার্যক্রম নিরাপদ রাখতে আমরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছি।”

নাটোরের পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে জেলার সব পশুর হাটে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাট এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পশু পরিবহন ও অর্থ লেনদেন নিরাপদ রাখতে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ে টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।”

নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “নাটোর এবারো কোরবানির পশু উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পশু সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপদে পশু বাজারজাতকরণ, হাট ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। খামারিরা যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং ক্রেতারা যেন ভেজালমুক্ত ও সুস্থ পশু কিনতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”