ঠাকুরগাঁও জেলা জজ কোর্টে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাকরি শেষে অবসরে যাওয়ার পরও একদল কর্মচারী এখনো দাপটের সঙ্গে অফিস করছেন; আবার জোর গলায় বলছেন, টাকার অভাব নেই, ‘জনসেবা’ করে দিচ্ছেন। তবে তাদের এই কর্মকাণ্ডে একদিকে চরম ক্ষুব্ধ বর্তমানে কর্মরত ও বিচারপ্রত্যাশীরা, অন্যদিকে একে পুরোপুরি আইনবহির্ভূত বলছেন সরকারি-বেসরকারি আইনজীবীরা।
একসময় আদালতে ‘উমেদার’ নামে এক শ্রেণির লোক দেখা যেত, যারা নিয়োগ ছাড়াই আদালতে নবিশীর কাজ করতেন ভবিষ্যতে স্থায়ী চাকরি পাওয়ার আশায়। ফারসি শব্দ উমেদ-এর অর্থ প্রত্যাশী, আকাঙ্ক্ষী। তবে শব্দটির ব্যবহারিক অর্থ এখন বদলে গেছে। উমেদার বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যের মন রক্ষা করে চলেন। সোজা কথায় ‘মোসাহেব’।
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টে বেতন-ভাতা ছাড়াই একঝাঁক সাবেক কর্মচারীর নিয়মিত অফিস করার নেপথ্যে ‘উপরি’ আয়ের একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে রাইজিংবিডি ডটকম। এই ব্যক্তিদের আচার-আচারণ সেই ‘উমেদার’ বা ‘মোসাহেব’-এর মতো। তবে তারা নবিশ নন, অবসরপ্রাপ্ত পাঁকা মোসাহেব।
এজলাসের গোপনীয়তা রক্ষা করার আইনি বাধ্যবাধকতার আড়ালে উমেদারদের দল এক অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টে।
বিচারপ্রার্থীদের কাছে আদালত পবিত্র স্থান। অথচ সেই পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করছেন একদল সাবেক কর্মচারী, যারা অনিয়মের শূঢ় ঢুকিয়ে দিয়েছেন আদালতের গভীরে।
সরকারের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের নিয়মিত অফিস করাকে আইনবহির্ভূত বলছেন। অবশ্য আদালতে অভিজ্ঞ কর্মচারীর সংকটের কথাও বলেছেন তিনি।
এক মাস ঘুরে গোপনীয়তার পর্দার আড়ালে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টে একদল অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর সন্ধান মেলে, যারা ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে চাকরির মেয়াদ শেষ করেছেন। অথচ আদালতের বারান্দায় তারা, অন্দরে-বাহিরেও তারা।
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের হিসাব শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে অন্তত ১০ জন কর্মচারী অবগরে গেছেন। তাদের পরিচয়ও মিলেছে নথিতে।
অবসরে যাওয়া এই কর্মচারীদের মধ্যে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের অফিস সহায়ক মো. আক্তার আলী অবসরে গেছেন ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল। অফিস সহায়ক মো. অলিউল হকের চাকরি শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। একই পদের সৈয়দ আলী ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর অবসরে গেছেন।
অফিস সহায়ক নজরুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, অফিস সহায়ক আব্দুল মতিন ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই, উচ্চমান সহকারী আনন্দ বাবু ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল, বেঞ্চ সহকারী সফি আলম ২০২৩ সালের ১ জুন, বেঞ্চ সহকারী ছবি আলম ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল, জারিকারক মিজানুর ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি এবং নাজির হামিদ অবসরে গেছেন ২০২০ সালে।
এমনকি জেলা জজ মো. জামাল হোসেনের এজলাসে সহকারী হিসেবে এখনো দায়িত্ব পালন করে যাওয়া রুহুল আমিনও প্রায় দেড় বছর আগে অবসরে গেছেন।
আদালতের গোপনীয়তাকে মান্য করে এসব কর্মচারীর বিষয়ে তথ্য জোগাড় করতে পদে পদে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ১০ জন কর্মচারী বেশিরভাগই এখনো নিয়মিত ডেস্কে বসছেন এবং দাপ্তরিক ফাইল নিয়ে ছোটাছুটি করছেন।
এমনকি বিচার চলাকালীন বিচারকের পাশেই এজলাসে অবস্থান করছেন এই অবৈধ কর্মচারীদের কেউ কেউ। তারা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের নানা আইনি কাজের তদারকি করে দিচ্ছেন এবং বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। সাধারণ মানুষের কাছে তারা নিজেদের এখনো ‘ক্ষমতাধর কর্মকর্তা’ হিসেবে জাহির করে চলেছেন।
অসুন্ধানের সময় হাতেনাতে ধরা পড়া কয়েকজনের ভিডিও ও স্থিরচিত্র রাইজিংবিডি ডটকমের হাতে রয়েছে।
সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ঠাকুরগাঁও আদালতের কয়েকটি সূত্রে জানায়, বিচারপ্রার্থীদের ফাইল আটকে রাখা, নকল তোলা বা দ্রুত জামিনের আশ্বাস দিয়ে অবৈধভাবে টাকা বাগিয়ে নিচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা। এই উপরি উপার্জনের পরিমাণ একজন নিয়মিত কর্মচারীর বেতনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলছেন, “হ্যাঁ, অনেক সময় এই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজ করার অভিযোগ পাওয়া যায়।”
এদিকে আদালতের কাজকর্ম এতটাই গোপন ও স্পর্শকাতর যে কর্মরত বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুঃখ করে অনেক কিছু বললেন। চাপে পড়ার ভয়ে অবশ্য তারা কেউ পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন কর্মচারী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “তারা চাকরি থেকে অবসরে গেছেন ঠিকই কিন্তু তাদের টেবিল আর ক্ষমতা ছাড়েননি। এর ফলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বা কর্মরত কর্মচারীরা কোণঠাঁসা হয়ে পড়ছেন। আর সাবেকদের কারণে দুর্নীতির ডালপালা বাড়ছে।”
অবসরে গিয়েও আদালতে দাপটের সঙ্গে নিয়মিত অফিস করা সাবেক কর্মচারীদের কয়েকজনের বিষয়ে খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এলো তাদের বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তথ্য। বেশির ভাগই বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গেছেন। কারো রয়েছে একাধিক বাড়ি, কেউ হয়েছেন বহুতল বাড়ির মালিক, কেউবা নামে-বেনামে কিনেছেন জমিজমা; যা তাদের সরকারি বেতনের সঙ্গে একদমই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, বিষয়টি জেলা জজ জানলেও তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের এক কর্মকর্তা বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অনেকের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সখ্য রয়েছে, যা তাদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে সাহস দিচ্ছে। প্রশাসনের এই নমনীয়তা বা ‘প্রশ্রয়’ ঠাকুরগাঁওয়ের বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে কয়েকজন বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে একজন হলেন হরিপুর থেকে আসা বিচারপ্রার্থী মিজানুর রহমান।
ক্ষোভ প্রকাশ করে মিজানুর রহমান বলেন, “আদালতে ঢুকলেই কিছু লোক ফাইল আগলে ধরেন। পরে শুনি তারা নাকি রিটায়ার্ড। কিন্তু টাকা ছাড়া তারা কোনো কাগজ নড়াতে দেন না।” আদালতে অবসরপ্রাপ্তদের দুর্নীতির বিষয়ে জানেন, এমন একজন হলেন ঠাকুরগাঁও শহরের বাসিন্দা হুসাইন সাইফুল্লাহ রুবেল।
রাইজিংবিডি ডটকমকে রুবেল বলেন, “বিচার বিভাগে আমরা সঠিক বিচারের প্রত্যাশা করি। কিন্তু বিচার বিভাগেই চোখে দেখা এতবড় অনিয়ম হচ্ছে। তাহলে গোপনে আরো কত কীইনা হয়ে যাচ্ছে! এমন চলতে থাকলে বিচার ব্যবস্থা থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে।”
‘অদ্ভুত আলোকবর্তিকা’ অভিযুক্ত সাবেক অফিস সহায়ক আক্তার আলীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, অবসরে যাওয়ার পরেও কাজে বহাল থাকা আইনবহির্ভূত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ কিনা। উত্তরে নিজেদের আলোকবর্তিকার সঙ্গে তুলনা করলেন।
অকপটে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এভাবে কাজ করে যাওয়া বৈধ না। তবে আমি জেলা জজের অনুমতি নিয়ে কাজ করছি। আমরা অভিজ্ঞরা না থাকলে জজ কোর্ট অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই সহযোগিতা করছি।” তবে জেলা জজ কোনো প্রকার লিখিত অনুমতি দিয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মৌখিক অনুমতি নেওয়া আছে।”
সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “কখনো কখনো এমনটি দেখা যায় যে, বিচারকের মৌখিক অনুমতিতে অবসরপ্রাপ্তরা আদালতের কাজ করেন। তবে আইনে এমন নেই।”
‘টাকার অভাব নেই, জনসেবা করতে যাই’ বিনা বেতনে অবৈধভাবে জজ কোর্টে অফিস করা অভিযুক্ত সাবেক অফিস সহায়ক সৈয়দ আলী বলেন, “আরো আট-দশ জন করতেছেন, তাই আমিও করতেছি। আমার অনেক টাকা আছে। টাকার জন্য আমি কাজ করি না। যাচ্ছি শুধু জনসেবা করতে।”
একজন সাংবাদিক অবসরপ্রাপ্তদের অবৈধভাবে কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে তথ্য জোগাড় করছেন, এমন খবর ছড়িয়ে গেলে অন্যান্য অভিযুক্ত কর্মচারী এই প্রতিবেদককে এড়িয়ে চলা শুরু করেন। এর পর তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তারা আর ফোন ধরছেন না। অনেকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
অনাঙ্ক্ষিত কর্মচারীদের প্রবেশ বন্ধ করার দাবি আইনজীবী ও জেলার সচেতন মহল মনে করছে, আদালতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় অননুমোদিত ব্যক্তিদের এমন দাপট বিচার প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অবিলম্বে তাদের আদালত চত্বর থেকে বের করে দিয়ে স্বচ্ছ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত।
ঠাকুরগাঁওয়ের সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, “এই ঘটনা জানার পরে আমি বিস্মিত হয়েছি। এটা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের হুমকি ও বাধা।”
“এই সিন্ডিকেট কীভাবে এতদিন আছে আদালতের মতো জায়গায়। যেখানে বিচার প্রার্থীর বিচারের ব্যবস্থা করা হয়, সেই যায়গায় কীভাবে এ রকম অবৈধ সিন্ডিকেট কাজ করে যাচ্ছে, এটা বড়ই আশ্চর্যের।” বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ঠাকুরগাঁও বার কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে।
রাইজিংবিডি ডটকমকে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগে কর্মরত এই কর্মচারীরা (১০ জন) অবসরে চলে গেছেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরে বেশ অবাক হলাম।” এই অবৈধ কর্মচারীদের আদালত ছাড়া করার জোর তাগিদ রেখে ইমরান হোসেন বলেন, “চোখের সামনে সাবেক কর্মচারীদের কাজ চালিয়ে যাওয়া বড় অন্যায়। এমন পরিস্থিতি বিচার ব্যবস্থার জন্য হুমকি স্বরূপ। কারণ, এটা অনেক সেনসেটিভ জায়গা। দ্রুতই এমন পরিস্থিতির নিরসন করা উচিত।”
‘আইনের তালা’ অবৈধভাবে সাবেক কর্মচারীদের এজলাসে কাজ করার মৌখিক অনুমতি দেওয়ার যে দাবি করেছেন অভিযুক্তরা এবং চোখের সামনে অবসরপ্রাপ্তদের ফাইল টানাটানির বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ঠাকুরগাঁও জেলা জজ মো. জামাল হোসেনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে তার বক্তব্য দেওয়ার নিয়ম নেই। তাই তিনি দেখাও দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন।
অবশ্য ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত ব্যক্তিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। আদালতের শৃ্ঙ্খলা বজায় রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলছেন, “চাকরি শেষ হওয়ার পর অভিজ্ঞ কর্মচারীদের প্রয়োজন পড়লে একটি নিয়মের মধ্যে বা আইনের আওতায় তাদের রাখা উচিত। নিয়মবহির্ভূতভাবে আদালতের এজলাসে কারো প্রবেশের সুযোগ নেই।”