ঠাকুরগাঁওয়ের পশুর হাটগুলোতে খামারি ও ব্যবসায়ীদের মুখে হাসির বদলে এখন চিন্তার ভাঁজ। হাটে সরবরাহ প্রচুর থাকলেও সেই তুলনায় ক্রেতা না থাকায় কমতে শুরু করেছে পশুর দাম, বিশেষ করে গরুর বাজার এখন বেশ নিম্নমুখী। ফলে এবার জেলায় বিপুল পরিমাণ পশু অবিক্রীত থেকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিক্রেতাদের মধ্যে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) ঠাকুরগাঁওয়ের পশুর হাটগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি হাটে কোরবানির পশুর ব্যাপক আমদানি রয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সমাগম থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের বাজেট এবার কিছুটা সীমিত, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বড় ও মাঝারি সাইজের গরুর ওপর। তুলনামূলকভাবে ছোট সাইজের গরু ও ছাগলের চাহিদা কিছুটা থাকলেও বড় গরুর ক্রেতা এক প্রকার মেলাই ভার।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচ উপজেলায় গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার খামার রয়েছে ৫ হাজার ৬৪২টি। এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৯৫ হাজার ৪৩৬টি পশু। এর মধ্যে ষাঁড় গরু ৩২ হাজার ২২২টি, বলদ ৭ হাজার ৭৩৩টি, গাভী ১৪ হাজার ৬৭০টি, মহিষ ১৭১টি, ছাগল ৩৯ হাজার ৬৩৫টি, ভেড়া ৯৫১টি ও অন্যান্য ৫৩টি পশু রয়েছে। জেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার, যা প্রস্তুতকৃত পশুর চাইতে ২৫ হাজার বেশি।
স্থানীয় খামারি ও পশু ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে পশু খাদ্যের চড়া দামের কারণে গরু লালন-পালনে তাদের খরচ অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। আশা ছিল, ঈদের হাটে ভালো দাম পেয়ে সেই লোকসান পুষিয়ে নেবেন। বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রথম দিকে কোরবানির পশুর দাম কিছুটা সন্তোষজনক থাকলেও। যত দিন যাচ্ছে ততই দাম কমছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার খোঁচা বাড়ি হাটে গরু বিক্রি করতে আসা খামারি সহিদুল ইসলাম বলেন, “বিগত এক বছর ধরে খৈল, ভূষি আর খড়ের যে দাম, তাতে একটা গরু তৈরি করতে জান বের হয়ে গেছে। এখন হাটে এনে দেখছি, গরুর দাম উল্টো কমতির দিকে। ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে আসল টাকাই উঠছে না। যদি এই দামে বিক্রি করতে হয়, তবে বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হবে। আর বিক্রি না করতে পারলে সারা বছরের খাটুনি আর পুঁজি দুটোই শেষ।”
একই শঙ্কার কথা জানালেন আকচা ইউনিয়ন থেকে আসা পশু ব্যবসায়ী সোহেল রানা। তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্ন গ্রাম ও ছোট খামার থেকে গরু কিনে বড় হাটে বিক্রির জন্য এনেছি। বাজারে গরুর অভাব নেই, কিন্তু ক্রেতারা দেখছেন বেশি, দাম করছেন কম। ঈদের আর মাত্র অল্প বাকি, অথচ এখনো অর্ধেকের বেশি গরু অবিক্রীত। এবার অনেক পশু অবিক্রীত থেকে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর এলাকার গরু ব্যবসায়ী তানভীর হাসান তানু বলেন, “খোঁচা বাড়ি হাটে গরু নিয়ে এসেছি। ক্রেতারা দামই বলতে চায় না। গত বছর যে গরু ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার একই সাইজের গরু দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”
ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার বাসিন্দা রতন তালুকদার বলেন, “আমরা গত বছর দুইটি গরু কিনেছিলাম। তবে এবার একটাই কিনেছি। এবার বাজেট একটু কম।”
হাজিপাড়ার তালেবুর বলেন, “গত বছর যে গরু কিনেছিলাম, ঠিক সেই সাইজের গরু এবার ১৫ হাজার টাকা কম দামে পেয়েছি। এবার বাজারে গরুর দাম বেশ কম।”
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় এবার পশুর উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশ ভালো। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ পশুর বিপরীতে স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাব ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে পুরো বাজার ব্যবস্থা ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলার খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবিক্রীত পশুদের পুনরায় খামারে ফিরিয়ে নিয়ে লালন-পালন করা ক্ষুদ্র খামারিদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
পশুর দাম কমে যাওয়া এবং বাজার মন্দা থাকার বিষয়টি নিয়ে খামারিদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও। সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি এবং খামারিদের উদ্বেগ প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইজাহার আহমেদ খান বলেন, “এবার ঠাকুরগাঁওয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। খামারিরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পশুগুলোকে হাটে তোলার উপযোগী করেছেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমরাও প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এবার বেশ কিছু পশু অবিক্রীত থেকে যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “পশুখাদ্যের বাড়তি মূল্যের কারণে খামারিদের উৎপাদন খরচ এমনিতেই বেশি, তার ওপর শেষ সময়ে এসে গরুর দাম কমে যাওয়াটা খামারিদের জন্য সত্যিই উদ্বেগের।"
তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ অফিসের পক্ষ থেকে হাটে আসা পশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মেডিকেল টিম কাজ করছে। তবে খামারিরা যাতে ন্যায্য মূল্য পান এবং অবিক্রীত পশুর সংখ্যা যেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, সেজন্য তারা বাজার মনিটরিং এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু বিক্রির বিষয়টি আরও জোরদার করার চেষ্টা করছেন।